বন্দে মাতরম ... বন্দে মাতরম ... ইনকিলাব জিন্দাবাদ ... ইনকিলাব জিন্দাবাদ ... জয় হিন্দ ... জয় ভারত ...ধ্বনি পুরো আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে যায়। লোকেরা অসম্ভব খুশি হয়ে বাজি-পটকা ফাটাতে থাকে। শিবমঙ্গল সিং মানুষকে সম্বোধন করেছিলেন। দেশভক্তির সাথে জড়িত বক্তৃতা দেন। যেন এক নতুন আবেগ সবার মন ভরে দেয়। স্বাধীনতার সকালে অর্থাৎ শুক্রবার, প্রত্যেকে রেডিওতে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর বক্তৃতার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। ভাষণটি সম্প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথে সব জায়গায় সম্মিলিতভাবে শোনা গিয়েছিল।
প্রবীণ নাগরিক শিবপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় 'শিলিগুড়ির ইতিহাস' রচয়িতা (তিনি গত বছরের একশতম বর্ষে পদার্পণ করেন) বলেছেন যে, "১৯৪৭ সালে, আগস্ট মাস শুরু হওয়ার সাথে সাথে স্বাধীনতার পরিবেশ তৈরি হতে শুরু করে। আমরা এখানে অমৃত বাজার পত্রিকা এবং আনন্দবাজার পত্রিকা এবং যুগান্তর- এর মতো সংবাদপত্রের মাধ্যমে স্বাধীনতার সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি আন্দোলন সম্পর্কে অবগত হতে থাকতাম। তখন পত্রিকাটি দুই পয়সায় আসত। তারপরেও একদিন পুরানো সংবাদপত্র পাওয়া যেত এখানে। তিনি বলেছেন যে, এখানে স্বাধীনতার এমন একটি পরিবেশ ছিল যে সর্বত্রই সেই আলোচনা চলত। সেই সময়, শিলিগুড়ির জনসংখ্যা সবে মাত্র ১০-১২ হাজার ছিল হয়তো। শিলিগুড়ি ছিল একটি ছোট্ট গ্রামের মতো।"
স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন যে, "শিলিগুড়িতে আজ যেখানে মায়ের ইচ্ছা কালীবাড়ি রয়েছে, সেই সময় সেখানে ঘন জঙ্গল ছিল। স্বাধীনতার মুক্তি যোদ্ধা গারম দলের লোকেরা এই বনেই অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিতেন। আরও বলা হয় যে, এখানকার 'ফাঁসিদেওয়া' ব্রিটিশ যুগে খুব বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হত। ব্রিটিশরা সেখানে স্বাধীনতার পক্ষে যারা ছিলেন তাঁদের এনে ফাঁসি দিত। এই কারণেই অঞ্চলটি ফাঁসিদেওয়া নামে পরিচিতি লাভ করেছিল।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক জাতীয় পিতা মহাত্মা গান্ধীও শিলিগুড়িতে এসেছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়। সময়টি ছিল ১৯২৫ সালের মে মাস। তখন মুক্তিযোদ্ধা দেশবন্ধু চিত্ত রঞ্জন দাস এখানে খুব অসুস্থ ছিলেন। মহাত্মা গান্ধী তাঁকে দেখতে এখানে এসেছিলেন। শিয়ালদহ হয়ে দার্জিলিং মেইলে পৌঁছে তিনি শিলিগুড়ি জংশনে পৌঁছেছিলেন (বর্তমানে শিলিগুড়ি টাউন স্টেশন, এখনও কিছুটা পরিবর্তন নিয়ে উপস্থিত রয়েছে)। এখান থেকে তিনি দার্জিলিং যান। সেই যাত্রায় তৎকালীন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা শিবমঙ্গল সিংও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। চিত্তরঞ্জন দাসের বাড়ীতে গিয়ে গান্ধীজী তাঁর যত্ন নেন এবং এক রাত সেখানে থাকেন। দার্জিলিং থেকে ফিরে আসার সময়, মহাত্মা গান্ধী শিলিগুড়িতে শিবমঙ্গল সিংয়ের বাড়ীতেও ছিলেন। একই সময়ে, গান্ধীজি কংগ্রেস নেতাকর্মীদের সাথে একটি বৈঠকও করেছিলেন। আজ নগরীর প্রথম দশ তলা নীলাদ্রি শিখর ভবনটি হাশমি চকের কাছে হিলকার্ট রোডের ওই বাড়ীটি দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
শহরের প্রখ্যাত উদ্যোক্তা ও সমাজসেবক শিবমঙ্গল সিংয়ের নাতি নন্দু সিংহ তাঁর পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে প্রাপ্ত স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেন যে, সেই সময় বাপুর সাথে বিরোধ জন্মেছিল। ঘটেছিল এমন যে, তাঁর দাদু (শিবমঙ্গল সিং) এখানে পাহাড়ি সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য অনুসারে 'খুকুরি' দেওয়ার সময় বাপুকে একটি খাদাও পড়িয়েছিলেন। তারপরে, সারা দেশে এটি আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে অহিংসার পুরোহিত কীভাবে সহিংসতার অস্ত্রের উপহার গ্রহণ করেছিলেন? গান্ধীজির বিরোধীরা এটি নিয়ে দারুণ ঝামেলা করেছিলেন তবে , সময়ের সাথে সাথে বিষয়টি ঠান্ডা হয়ে যায়।
অনুরূপ স্মৃতি মনে করে নন্দু সিং বলেন যে, "স্বাধীনতার সময় জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিং জেলার লোকেরা এই দ্বিধায় ছিল যে, এই অঞ্চলটি কার দিকে যাবে? আমরা কি পাকিস্তানে না ভারতে স্বাধীনতার সকাল দেখতে পাব? তারপরে, এটি ছিল সর্বত্র আলোচনার সবচেয়ে বড় বিষয়। যাক, সবশেষে স্বাধীনতা পেয়েছি। এখানে রংপুর বিভাগ এবং এর বাইরে পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) পরিণত হয়েছিল। শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়িসহ পুরো উত্তরবঙ্গ তাদের প্রিয় হিন্দুস্তানেই থেকে গেল।"
(সংগৃহীত)

No comments:
Post a Comment