চড়া রোদেও সুন্দরী গাছের ফাঁক দিয়ে তেমন আলো গলছিল না। ক্রমশ সরু হয়ে আসা খাঁড়ির প্রায় মাঝামাঝি হঠাৎই গতি কমিয়ে দিল লঞ্চটা। চারিদকে সড়কখালির জঙ্গল। লঞ্চটা এগোচ্ছিল সজনেখালি হয়ে সড়কখালি ১ নম্বর খাঁড়ি ধরে।
সুন্দরবনের ভয়াল জঙ্গল যেখানে ক্রমশ গাঢ় হয়েছে, ঠিক সেইখানেই নদীর চড়ায় শুয়ে রোদ পোয়াচ্ছিল সে। গতর নেড়ে এদিক—ওদিক করার তেমন ইচ্ছে ছিল বলে মনে হল না। কাদায় মাখা। দূর থেকে ঠাওর করা মুশকিল। লঞ্চটা আর একটু কাছে যেতেই বোঝা গেল আসল চেহারাটা। লেজটা জলে ঝাপট দিয়ে নড়েচড়ে উঠল সুন্দরবনের জলে থাকা সাক্ষাৎ প্রাণঘাতী সরীসৃপ। লম্বায় তা প্রায় ১৬—১৭ ফুট তো হবেই। গায়ের শক্ত চামড়ার কাঁটা কাঁটা দেহটা দেখে যদি ভয় লাগে, তাহলে চোয়ালটা ফাঁক হতে করাতের মতো দাঁতগুলো দেখে প্রাণ খাঁচাছাড়া হওয়ার যোগাড়।
এমন ধারালো অস্ত্রের কোপে পড়লে যে কোনওভাবেই কোনও নিস্তার নেই, সেটা আমার হতভম্ব মুখের ভাব দেখে বলে দিলেন লঞ্চের চালকই। স্টিয়ারিংটা ঘোরাতে ঘোরাতে কিনারা থেকে লঞ্চটা দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বললেন, “আপনারা তো শুধু বাঘের গল্পই বলেন। এমন সাক্ষাৎ যমদূত এই জলা জঙ্গলে আর দু’টি নেই। বাঘের হামলায় মারা যাওয়া নিয়ে কত কথা হয়, কিন্তু কত গরিব মানুষ যে মাছ—কাঁকড়া ধরতে গিয়ে, মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে কুমীরের হামলার শিকার হয় তা জানেন?”
এমন কত গল্পই না ভেসে বেড়াচ্ছে লোনা জলে। হাওয়ায় হাওয়ায় পাক খাচ্ছেে সুন্দরী গাছের আনাচে কানাচে। এখানকার জল—জঙ্গলের মাঝে থাকা মানুষগুলোর যে রুজি—রুটি এই জঙ্গলই। সেখানেই ঘাপটি মেরে থাকে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। আর জলে চুপিসাড়ে ঘাপটি মেরে থাকে কুমীর। সাপের হিলহিলে শরীরে জড়িয়ে থাকে মৃত্যুর হাতছানি। সে সব নিয়েই ভয়ঙ্কর এক ভূখণ্ডের হাতছানি সুন্দরবন।

No comments:
Post a Comment