প্রদীপ ভট্টাচার্য, প্রেসকার্ড নিউজ: ভীম চন্দ্র নাগ, নামটি শুনলেই মনে পড়ে যায় 'কড়াপাক' নামক সন্দেশটির কথা। এমন কোনও বাঙালী নেই যিনি এর স্বাদ জানেন না। ১৮২৬ সালে হুগলির জনাই এর প্রাণ চন্দ্র নাগ একটি মিষ্টির দোকান খুললেন কলকাতার বৌবাজার অঞ্চলে।
পরে এই দোকানের দায়িত্ব নিলেন তারই সুপুত্র ভীম চন্দ্র নাগ। দোকানটি আজও একই জায়গায় স্বমহিমায় অবস্থিত। আজ এই দোকানের সম্বন্ধেই বলবো অজানা কিছু কাহিনী।
১৮৫৭ সালে আমাদের দেশে গভর্ণর জেনারেল হয়ে আসেন চার্লস ক্যানিং ও তার স্ত্রী লেডি ক্যানিং। এদেশের সফরকালে লেডি ক্যানিং এর জন্মদিন উপলক্ষে ভীম চন্দ্র নাগ একটি ভাজা মিষ্টি তৈরি করেন।
মিষ্টিটি দুজনেরই খুব ভালো লাগে এবং তারা খুব প্রশংসাও করেন। এরপর থেকে প্রতিটি জমায়েত ও অনুষ্ঠানে এদের দুজনের কথামতো এই মিষ্টিটি হাজির থাকতো।
লেডি ক্যানিংকে সম্মান জানাতে ভীম চন্দ্র নাগ এই মিষ্টির নাম রাখলেন লেডি ক্যানিং। লোকমুখে যা হয়ে দাঁড়ায় লেডিকেনি। যা আমরা আজও পরম তৃপ্তিতে খেয়ে চলেছি। পরবর্তী কালে এই 'লেডিকেনি' প্রবল জনপ্রিয়তা পায়।এখনো এরা এই মিষ্টিটি করে চলেছেন পরম যত্নে ও মমতায়।
দোকানের আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এদের দেওয়াল ঘড়ি। এদের দোকানের লোগোতে যদি আপনার কোনো দিন চোখ পড়ে,
তাহলে দেখবেন, সেখানে একেবারে মাঝখানে জ্বলজ্বল করছে একটি ঘড়ি।
শুনে হয়তো ভাবছেন এ আবার আশ্চর্যের কি ? আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঘড়িটির ডায়ালের সংখ্যাগুলো লেখা আছে বাংলা হরফে, যেমন এক, দুই, তিন ইত্যাদি।
এছাড়া নির্মাতার নাম "কুক এ্যান্ড কেলভী অব লন্ডন"ও লেখা আছে বাংলা হরফে। যারা ইংরেজি ছাড়া কিছু বোঝে না। তাহলে ব্যাপারটা কী ?
১৮৫৮ সালের আশেপাশে এই কুক এ্যান্ড কেলভী'র যাত্রা শুরু হয় এই কোলকাতা থেকেই।
শোনা যায় এই সময় একদিন লন্ডনের এই বিখ্যাত ঘড়ি নির্মাতা সংস্থার বড়োবাবু সন্দেশ খেতে যান ভীম নাগের দোকানে। মিষ্টি খেয়ে তিনি খুবই খুশী হন এবং প্রশংসাও করেন।
এবার তিনি দোকানের চারদিকে তাকিয়ে কোনও ঘড়ি দেখতে না পেয়ে আশ্চর্য হন এবং ভীম নাগকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করেন। ভীম নাগ তখন তার অপারগতার কথা জানালে বড়বাবু তাকে বলেন তার অফিস থেকে একটা ঘড়ি নিয়ে আসতে।
ভীম নাগ তখন কোনও সংকোচ না করেই তাকে বলেন তার কর্মচারীরা ইংরেজিতে সংখ্যা লেখা ঘড়িতে সময় দেখতে পারবেননা। এরপরই ঘটে সেই আশ্চর্য ঘটনা। কয়েক দিনের মধ্যেই সুদূর লন্ডন থেকে বাংলা হরফে সংখ্যা লেখা ঘড়ি পৌঁছে যায় ভীম নাগের দোকানে।
শুধু তা-ই নয়, সেখানে বাংলায় বড়ো বড়ো করে লেখা লন্ডনের 'কুক এ্যান্ড কেলভী'র নামও।
সে ঘড়ি এখনও সচল রেখেছেন ভীম নাগ কর্তৃপক্ষ। আজও আপনি দোকানে ঢুকে শান্তভাবে কান পাতলেই শুনতে পাবেন কুক এ্যান্ড কেলভী'র তৈরী ঘড়ির হৃৎস্পন্দন।
ধন্যবাদ ভীম চন্দ্র নাগের সকল সদস্যদের এমন একটি প্রাচীন ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
No comments:
Post a Comment