সত্যজিৎ চক্রবর্তী | অতিথি লেখক |
নীতি আদর্শ আর জনসেবার থেকে বড় হল পাওয়ার পয়েন্ট। আর এই পাওয়ার পয়েন্ট কোন্দলই শাসক বিজেপির কাছে বড় স্বস্তি। বিজেপির একক সংখ্যা গরিষ্ঠতার সামনে দেশের প্রাচীন দল কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেস, শিবসেনা সহ বহু আঞ্চলিক দল ধুলিস্যাত বললে খুব একটা ভুল হবেনা। 2024 এর লোকসভা নির্বাচনের আগে ভারতীয় রাজনীতিতে বড় প্রশ্ন কে ভালো আর কে কতটা দেশবাসীর জন্য কতটা কম ক্ষতিকর ? প্রশ্নটি সামনে আনার কৃতিত্ব অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের। শিব সেনা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৃতিত্বে পালক সহ মুকুট পরালেন।
দেশ ভাগ করে শাসন ক্ষমতায় দীর্ঘ দিন বসার দরুন কংগ্রেস দেশের প্রাচীন দল। কংগ্রেসের নীতি আদর্শকে মানতে না পেরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করেন তৃণমূল কংগ্রেস। বামেদের 34 বছরের শাসন ভেঙে চুরে চুরমার করে বাংলার মন জয় করে তৃতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় এসেছেন বিজেপিকে হারিয়ে আর বাম কংগ্রেসকে কার্যত মুছে দিয়ে। শেষ আড়াই দশকের রাজনীতিতে তৃণমূল যখন বড় হয়েছে তখন কংগ্রেস আর বামেরা নিশ্চিহ্ন হয়েগেছে।
অন্যদিকে শিবসেনার রাজনৈতিক জন্ম যে নীতির ওপর ভিত্তি করে তা হল জাতীয়তাবাদ আর হিন্দুত্ব রক্ষা করা তা বিসর্জন দিয়ে দেশের সব থেকে বেশি ক্ষতিকর শাসক দল কংগ্রেসের সাথে জোট করে বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করে মহারাষ্ট্রের ক্ষমতায় বসা। দেশের উন্নয়নের সাথে ক্ষতির তুলনা করলে কংগ্রেস দেশের সব থেকে বেশি ক্ষতিকরা দল তা মুখে অস্বীকার করলেও খতিয়ান থেকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়।
তৃণমূল কংগ্রেস শিব সেনার মতন জোট করে ক্ষমতায় আসেনি। কিংবা দলকে শক্তিশালী করার দিক থেকে শিবসেনার থেকেও এগিয়ে। তৃণমূল কংগ্রেসের মতন আরেকটি দল হল আম আদমী পার্টি। তারাও নবীন রাজনৈতিক দল হয়ে বেশ শক্তিশালী।
ইউপিএ সরকারের 2004 থেকে 2014 শাসনকালের দশ বছরে বিজেপি নিজের শক্তি বৃদ্ধি করে 2014 সালে ক্ষমতায় বসে 2019 সালে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতার চমক দেখিয়ে শক্তিশালী সরকার গড়েছে। বিজেপির এই শক্তিশালী হওয়ার সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সামনে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে। সেদিক থেকে বিজেপির সাথে লড়াই করার জন্য বিরোধী জোটের দিক থেকে নেতৃত্বের দাবি রাখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরবিন্দ কেজরিওয়াল। নবীন দুটি দলের জনপ্রিয়তা এবং বিজেপি বিরোধীতার পুরুষত্বকে মেনে নিতে শিবসেনার পৌরুষে কার্যত আঘাত লেগেছে। স্বস্তা ভাবনা আবেগ দিয়ে একথা বলাই যায়।
তবে রাজনৈতিক অংকে শিবসেনার দাবী বক্তব্য ঠিক। কারণ বিজেপির বিরোধীতা করে ক্ষমতায় বসতে কংগ্রেসকে নিয়েছে। জোট সাথী কংগ্রেসের বিরোধীতা করা এই মুহুর্তে কঠিন এবং জোট নীতি বিরুদ্ধ। উল্টো দিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এরকম কোনও প্রতিবন্ধকতা কিংবা বাধ্যবাধকতা নেই।
আবার শিবসেনা ও তৃণমূল কংগ্রেসের বিজেপি এবং কংগ্রেস উভয়ের সাথে জোট করে ক্ষমতায় থাকার অভিজ্ঞতা আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্ষেত্রেও এগিয়ে কারণ, এনডিএ ও ইউপিএ দুই সরকার থেকে বেরিয়ে আসার হিম্মৎ তিনিই দেখিয়েছেন এবং সরকারে টিকে আছেন যেটা শিবসেনার নেই।
দেশের পরিকাঠামো উন্নয়ন করতে ব্যর্থ এবং দূর্নীতি করার দিক থেকে এগিয়ে কংগ্রেস। বিজেপি নয়। এই চরম ও পরম সত্যিটা জনগন বুঝেছে বলেই বিজেপি আজ ক্ষমতায়।
বিজেপি কংগ্রেসের সাথে তুলনায় এগিয়ে থাকলেও বিজেপির ব্যর্থতা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালী উদ্বাস্তুদের আশা স্বপ্নে জল ঢালার ভূমিকা কংগ্রেস, বাম ও তৃণমূল কংগ্রেসের সারিতে। নাগরিকত্ব সংশোধন আইন নিয়ে ল্যাজেগোবরে। পরিকল্পনায় গলদ ছিল বলেই মনে করেন উদ্বাস্তু বাঙালী পরিবারের সদস্যরা । তাদের আশা স্বপ্ন সেই তিমিরে। উদ্বাস্তু দশা আর ঘুঁচল না।
বিজেপি জন্মের আগে থেকেই শিবসেনা সাম্প্রদায়িক তকমা পেয়েছে যাদের থেকে সেই তারাই এখন শিবসেনার পরম বান্ধব। ধর্ম দূর্নীতির রাজনীতিতে বোরকা পরে ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনীতি করা কংগ্রেস বাম ও তৃণমূল ধর্ম সাম্প্রদায়িকতার বিরোধীতা করে বর্ণ সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতিতে আবার বেশ পটু। যদিও ভারতীয় রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলো কথায় কথায় সংবিধান টেনে রাজনীতি করলেও সংবিধান মানার ক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকা বিতর্কিত করেছে।
শনিবার শিবসেনা ইউপিএ-র সমান্তরাল বিরোধী জোট তৈরি করার সময় গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি কংগ্রেসকে জাতীয় রাজনীতি থেকে দূরে রাখার টিএমসির কৌশলকে প্রত্যাখ্যান করা ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং অন্যান্য 'ফ্যাসিবাদী' শক্তিকে শক্তিশালী করার মতো।
উল্টোদিকে শনিবার টিএমসি নেতৃত্ব ইউপিএ-র সমান্তরাল একটি বিরোধী জোট গড়তে দলের প্রচেষ্টার বিষয়ে শিবসেনার মন্তব্যকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে অস্বীকার করেছে এবং বলেছে যে কংগ্রেস ব্যর্থ হওয়ায় এটি একটি বিকল্প ফ্রন্ট তৈরি করতে থাকবে।
এভাবেই টিএমসি প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল বর্তমানে কংগ্রেসের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। কংগ্রেসকে বাঁচাতে তৃণমূল বিরোধীতায় জড়িয়েছে শিবসেনা।
দলের মুখপত্র 'সামনা'-এর একটি সম্পাদকীয়তে, শিব সেনা আরও বলেছে যে, যারা কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স (ইউপিএ) চায় না, তাদের পর্দার আড়ালে কথা বলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার পরিবর্তে তাদের অবস্থান প্রকাশ্যে পরিষ্কার করা উচিৎ।
টিএমসি সাংসদ সৌগত রায় বলেছেন, "শিবসেনা মতামত জানানোর স্বাধীনতা আছে । তবে কোনটা সঠিক এবং ভুল তা নিয়ে কথা না বলা যাক। শিবসেনা নিজেই বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র অংশ ছিল। মহারাষ্ট্রে মুখ্যমন্ত্রীর পদ নিয়ে দ্বন্দ্বের পর এটি এনডিএ ছেড়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারের জন্য এনসিপি এবং কংগ্রেসের সাথে হাত মিলিয়েছেন।"
তৃণমূলের কংগ্রেস নিয়ে অবস্থান সম্পর্কে শিবসেনা আবার ভুল বলেনি। কারণ, তৃণমূলের সাংসদ সৌগত রায় বলেছেন, "টিএমসি শুধুমাত্র বিরোধী ঐক্যকে শক্তিশালী করতে চায়। আমরা কখনই বলিনি যে কংগ্রেস ছাড়া বিরোধী জোট গঠন করা হবে। কিন্তু কংগ্রেস যদি তার দায়িত্ব পালন করতে না পারে তবে আমাদের কিছুই করার নেই। তারা তাদের অযোগ্যতার জন্য আমাদের দোষ দিতে পারে না। একজন ব্যর্থ হলে, অন্য কাউকে শূন্যতা পূরণ করতে হবে।"
আবার টিএমসির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ বলেছেন, "আমরা শিবসেনার সাথে কোনো ভুল বোঝাবুঝি চাই না। কংগ্রেসের সমর্থনে তারা মহারাষ্ট্রে সরকার চালাচ্ছে। তাই তাদের কিছু বাধ্যবাধকতা আছে এবং সেই বাধ্যবাধকতা থেকেই এই বিবৃতিগুলো করা হয়েছে।"
টিএমসির মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে, প্রবীণ কংগ্রেস নেতা এবং সাংসদ প্রদীপ ভট্টাচার্য বলেছেন যে, "টিএমসির ক্রিয়াকলাপ এবং বিবৃতি কেবল বিজেপিকে সাহায্য করতে চলেছে। মনে হচ্ছে টিএমসি বিজেপির চেয়ে কংগ্রেসের সাথে লড়াই করতে বেশি আগ্রহী। টিএমসি বিরোধী ঐক্য ভাঙতে এবং তার রাজনৈতিক স্বার্থে বিজেপিকে সাহায্য করার জন্য সবকিছু করছে।"
বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করতে কংগ্রেসের ব্যর্থতার অভিযোগে টিএমসি অস্ত্রের মুখে পড়েছে। ব্যানার্জি তার সাম্প্রতিক মুম্বাই সফরের সময় বলেছিলেন যে "ইউপিএ নেই।"
তার শিবির কংগ্রেসকে একটি "অক্ষম এবং অযোগ্য" দল বলে অভিহিত করেছে যা "ডিপ ফ্রিজারে" চলে গেছে।
গত সপ্তাহে, বাংলার শাসক শিবির বলেছিল যে সংসদের শীতকালীন অধিবেশন চলাকালীন কংগ্রেসের সাথে সমন্বয় করতে তারা "অনাগ্রহী" তবে জনগণের স্বার্থ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে অন্যান্য বিরোধী দলগুলির সাথে সহযোগিতা করবে।
বি দ্র : লেখকের ব্যাখ্যার সাথে প্রেসকার্ড নিউজের নীতির কোনও সম্পর্ক নেই।
No comments:
Post a Comment