কোনও রকম আলোচনা ছাড়াই সংসদের দুই কক্ষে (লোকসভা ও রাজ্যসভা) পাস হয়ে গেল কৃষি আইন প্রত্যাহার সম্পর্কিত বিল। সোমবার সংসদের শীতকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই লোকসভায় কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র সিং তোমার কৃষি আইন প্রত্যাহার বিল উত্থাপন করেন। এরপর উপস্থিত সাংসদদের ধ্বনি ভোটের মাধ্যমে এই বিল পাস হয় সংসদে নিন্মকক্ষ লোকসভায়, যদিও এই বিল পাসকে ঘিরে রীতিমতো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ। বিরোধীদের স্লোগানের জেরে দফায় দফায় মুলতুবি হয়ে যায় সংসদের অধিবেশন।
অধিবেশনের প্রথম দিনেই কৃষি আইন প্রত্যাহার বিল পাস করা হবে, তা একপ্রকার পূর্ব নির্ধারিতই ছিল। কিন্তু বিরোধীদের দাবী ছিল, ওই আইন প্রত্যাহারের বিল পাস করার আগে এর ওপর সংসদে আলোচনা হোক। বিরোধীদের অভিযোগ, কৃষকদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কোনওরকম আলোচনা করতে চায় না মোদী সরকার। সরকার কেবল দ্রুততার সাথে বিল পাস করাতেই মরিয়া। কিন্তু সরকার পক্ষ কোন রকম আলোচনা খারিজ করে দেয়। এরপরই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ। বিক্ষোভের জেরে অধিবেশন মুলতুবি করে দেওয়া হয়।
পরে ফের অধিবেশন শুরু হলে কৃষিমন্ত্রী এই বিল উত্থাপন করেন এবং ধ্বনি ভোটের মাধ্যমে এই বিল লোকসভায় পাস হয়ে যায়। দুপুর ১২.০৬ মিনিটে বিলটি পেশ করেন কৃষিমন্ত্রী এবং মাত্র চার মিনিটের মধ্যে অর্থাৎ ১২.১০ মিনিটে তা পাস হয়ে যায়।
অন্যদিকে দুপুর ২ টা নাগাদ রাজ্যসভার অধিবেশন শুরু হলে কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী সেখানেও এই বিলটি উত্থাপন করেন। কিন্তু সেখানে এই বিলের ওপর আলোচনার দাবী জানায় বিরোধীরা। কিন্তু বিরোধীদের বিক্ষোভকে আমল না দিয়ে কোনও রকম আলোচনা ছাড়াই সেখানেও এই বিল পাস হয়ে যায়। সূত্রে খবর, সোমবার রাতেই ওই বিলটিতে স্বাক্ষরের জন্য রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোভিন্দের কাছে পাঠানো হতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সংসদে পাস হয় এই তিন কৃষি আইন। এগুলি হল ‘দ্য ফার্মার্স প্রোডিউস ট্রেড এন্ড কমার্স (প্রোমোশন অ্যান্ড ফেসিলিটেশন) অ্যাক্ট’, ‘দ্য ফার্মার্স (এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড প্রোটেকশন) এগ্রিমেন্ট অব প্রাইস অ্যাসুরেন্স অ্যান্ড ফার্ম সার্ভিসেস অ্যাক্ট’, দ্য এশেনসিয়াল কমোডিটিস (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট’।
কিন্তু বিতর্কিত তিন কৃষি আইন বাতিলের দাবীতে গত ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর থেকে দিল্লী-হরিয়ানা সীমান্তে আন্দোলন চালিয়ে আসছে হরিয়ানা, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ সহ বেশ কয়েকটি রাজ্যের হাজার হাজার কৃষকরা। সময় যত গড়িয়েছে, কৃষকদের এই আন্দোলনের তীব্রতা ততই বেড়েছে। আন্দোলন চলাকালীন সময়ে কয়েকজন কৃষক আত্মহত্যাও করেন। সমস্যা সমাধানে কৃষকদের সাথে কেন্দ্রের কয়েক দফায় আলোচনা হলেও সমাধান সূত্র থেকে যায় অধরাই।
এরই মধ্যে বিক্ষোভরত কৃষকদের হয়ে তিন কৃষি আইনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলাও হয়। তিন কৃষি আইনের বৈধতা নিয়ে কংগ্রেস, সিপিআইএম, তৃণমূল কংগ্রেস, আপ, এনসিপি সহ বিভিন্ন বিজেপি বিরোধী দলগুলি প্রশ্ন তুলে এই আইন প্রত্যাহারের দাবীও জানায়। স্বাভাবিক ভাবেই গোটা বিষয়টি ধীরে ধীরে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে।
এমন এক পরিস্থিতিতে গত ১৯ নভেম্বর দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে বিতর্কিত তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার করে নেওয়ার কথা ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। চলতি মাসের মধ্যেই এই আইন ফিরিয়ে নেওয়ার সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছিলেন মোদী।
এদিকে সংসদের গত বর্ষাকালীন অধিবেশনে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার অভিযোগে রাজ্যসভার ১২ জন সাংসদকে সাসপেন্ড করা হল এদিন। এদের মধ্যে ২ জন হলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ, এছাড়াও কংগ্রেসের ৬ জন, শিবসেনার ২ জন এবং সিপিআইএম ও সিপিআই’এর ১ জন করে সাংসদ আছেন। গত আগষ্ট মাসে রাজ্যসভার অধিবেশন চলাকালীন সময়ে অভিযুক্ত সাংসদরা বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন। সেসময় সংসদের নিরাপত্তা কর্মীদের সাথেও তাদের ধস্তাধস্তি হয়। কয়েক জন নিরাপত্তা কর্মীদের মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ। সেই ঘটনার প্রেক্ষিতেই একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। এরপর এই শাস্তি। সেক্ষেত্রে চলমান শীতকালীন অধিবেশনে এই সাংসদরা আর উপস্থিত থাকতে পারবেন না। রাজ্যসভার ইতিহাসে যা প্রায় নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত।
No comments:
Post a Comment