নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বেওয়ারিশ লাশের সৎকার নিয়ে লাগাতার তর্কবিতর্কে তোলপাড় রাজ্য। কি করে বেওয়ারিশ লাশ গড়িয়া শ্মশানে সৎকারের জন্য নিয়ে আসা হতে পারে ! আদৌ কর্পোরেশনের তরফে কোনও রকম বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে কিনা ! বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই এই ধরনের প্রশ্ন উঠতে থাকে রাজ্য প্রশাসন থেকে শুরু করে সর্বস্তরে। যদিও কর্পোরেশনের বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে তাঁর জানা নেই বলেই এদিন মন্তব্য করেন কলকাতা পুরসভার প্রশাসক তথা পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। অন্যদিকে এরপরেই এদিনের ঘটনার সঙ্গে 'নন্দীগ্রামে সিপিএম-এর লাশ চুরি'র ঘটনার তুলনা করেন বঙ্গ বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ।
বুধবার সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। তাতে দেখা যায়, গড়িয়ার আদি মহাশ্মশানে একজন কর্মী আঁকশি দিয়ে টেনে পচা-গলা মৃতদেহ গাড়িতে তুলছেন। সেই গাড়িটির গায়ে কলকাতা পুরসভা লেখা রয়েছে। এই সমস্ত মৃতদেহগুলি করোনা আক্রান্ত সন্দেহে বিক্ষোভ দেখাতে থাকে স্থানীয়রা। বাধ্য হয়ে পুনরায় সেই দেহগুলি কে গাড়িতে করে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। যদিও এই মৃতদেহগুলি সঙ্গে করোনার কোন সম্পর্ক নেই বলেই স্পষ্ট জানিয়ে দেয় স্বাস্থ্য দফতর। এদিকে প্রশ্ন উঠতে থাকে বেওয়ারিশ লাশ কি করে গড়িয়া মহাশ্মশানে দাহ করার জন্য আনা হল?
এই ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই বিতর্ক শুরু হয়ে যায় রাজ্য জুড়ে। যদিও তারপরেই এবিষয়ে কলকাতা পুরসভার একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ্যে আসে। ওই বিজ্ঞপ্তি ২৯ শে মে প্রকাশ করে কলকাতা পুরসভা। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী পুর কর্তৃপক্ষ বেওয়ারিশ লাশ পোড়ানোর জন্য গড়িয়ার আদি মহাশ্মশানকে চিহ্নিত করেছে। এই বিজ্ঞপ্তিতে সই রয়েছে কলকাতা পুরসভার চিপ মিউনিসিপাল হেলথ অফিসর। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এতদিন পর্যন্ত বেওয়ারিশ লাশ পোড়ানোর জন্য ধাপার পরিত্যক্ত স্থানকে ব্যবহার করা হতো। এখন যেহেতু ধাপায় করোনায় মৃত হিন্দুদের দেহ পোড়ানো হয়, সেক্ষেত্রে বেওয়ারিশ লাশ পোড়ানোর জন্য গড়িয়া মহাশ্মশান ও নিমতলা শ্মশানকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই বিজ্ঞপ্তির একটি কপি দেওয়া হয়েছে প্রশাসকের কাছে, এমনটাই জানানো হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।
এদিকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে, বিজ্ঞপ্তি সম্পর্কে জানা নেই বলে মন্তব্য করেন কলকাতা পুরসভার প্রশাসক ফিরহাদ হাকিম। এ বিষয়ে প্রশাসক বলেন, 'আমার ঠিক জানা নেই গড়িয়ায় বেওয়ারিশ লাশ পোড়ানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে কিনা কর্পোরেশনের তরফে। তবে ধাপায় করোনা বডি পোড়ানো হচ্ছে বলে হয়তো গড়িয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে কালীঘাট শ্মশানেও বেওয়ারিশ লাশ পোড়ানো হয়ে থাকে।'
এদিকে এই ঘটনাকে 'নন্দীগ্রামে সিপিএম-এর লাশ চুরি'র সঙ্গে তুলনা করেন বঙ্গ বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ। তিনি বলেন, 'নন্দীগ্রামে সিপিএম লাশ চুরি করেছিল। তৃণমূল করোনায় মৃতদের লাশ চুরি করছে। খবর আছে মৃতদেহগুলো অ্যাসিড দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে তার পরিচয় না জানা যায়।' এরপরে রাজ্য সরকারের উদ্দেশ্যে বিষ উগরে তিনি বলেন, 'অমানবিক ঘটনা দেহ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। নক্কারজনক। মারা যাওয়ার পরেও সম্মান দেওয়া হয়নি। করোনায় মৃতদের এদিক-ওদিক লুকিয়ে পড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল, মানুষ বাধা দিয়েছিল বলে সেই সমস্ত লাশ রেখে দেওয়া হয়েছিল, যেগুলো আজ বের করা হয়েছে। যুদ্ধে পরাজিত বিদেশি শত্রুদের ক্ষেত্রেও সৎকারের সময় এ ধরনের আচরণ করা হয় না, রাজ্যবাসীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী যেটা করছেন।'
যদিও এই মৃতদেহগুলি সঙ্গে করোনার কোন সম্পর্ক নেই বলেই স্পষ্ট জানিয়ে দেয় স্বাস্থ্য দফতর। এমনটাই খবর পুলিশ সূত্রে। জানা গিয়েছে, স্বাস্থ্য দফতরের তরফে পুলিশকে অফিশিয়ালি জানানো হয়েছে ওই দেহগুলির সাথে কোনভাবেই কোভিডের যোগ নেই। অন্যদিকে মৃতদেহগুলি এনআরএস হাসপাতালে ছিল বলেই জানিয়েছে খোদ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এনআরএস হাসপাতালের তরফে জানানো হয়, এই লাশগুলি ছিল এনআরএস হাসপাতালের মর্গে। সবকটাই ছিল বেওয়ারিশ লাশ। ১৫ দিন ধরে লাশ গুলি হাসপাতালের মর্গে ছিল। কোন দাবিদার না থাকায় এদিন মোট ১৪ টি বডি কলকাতা পুরসভার হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু এই লাশ গুলির সঙ্গে কোভিডের যোগ নেই। এরপরেই এনআরএস হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফে চিঠি দেওয়া হয় কলকাতা পুলিশ কমিশনারকে। চিঠিতে জানানো হয়েছে, গড়িয়া মহাশ্মশানে যে দেহ গুলি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেগুলো বেওয়ারিশ লাশ ছিল। কিন্তু কোভিড পজিটিভ ছিল না। সোশ্যাল মিডিয়ায় মৃতদেহগুলি কোভিড পজিটিভ বলে যে প্রচার চলেছে তা ফেক। এই প্রচারের নেপথ্যে যারা রয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফে।

No comments:
Post a Comment