জল্পনার শেষ নেই। যেভাবে রাজ্যের রাজনীতি এগোচ্ছে, তাতে এখন সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি কথা। তা হলো, সত্যিই কি পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়ে যেতে পারে?
সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ), জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) ও জাতীয় জনসংখ্যা নিবন্ধন (এনপিআর) নিয়ে রাজ্য এখন উত্তাল। এগুলোর বিরুদ্ধে পথে নেমেছে তৃণমূল কংগ্রেস, জাতীয় কংগ্রেস ও বাম দল। এই দলগুলোর একটাই দাবি ‘মানছি না মানব না সিএএ-এনআরসি-এনআরপি’।
বিরোধীরা বলছে, এসব আইনের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টি করা হচ্ছে। এই বিভাজন রুখতে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রাজ্যে যুগ যুগ ধরে যেভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি লালিত হয়ে আসছে, তার মাঝে কোন ফাটল ধরাতে দেওয়া হবে না। এসব আইন বাতিলের দাবিতে প্রয়োজনে রাজ্যের মানুষ রাজপথে থেকে লড়াই করবে।
অন্যদিকে বিজেপিও বসে নেই। তারা মাঠে নেমেছে। তারা বলছে, এমন কী হল এই সিএএ নিয়ে? এ আইন তো পাস হয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা সংখ্যালঘু নাগরিকদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য। এতে এমন কি ক্ষতিটা হল রাজ্যের? এই সেদিনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মতুয়া সম্প্রদায়ের লাখো মানুষকে নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য তৎপর হয়েছিলেন। মতুয়াদের নাগরিকত্বের জন্য আন্দোলন করেছিলেন। আজ কেন মমতা নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে?
রাজ্য বিজেপির নেতারা বলছেন, এই মমতাই ২০০৫ সালে রাজ্যে এনআরসির দাবি তুলেছিলেন। বলেছিলেন, রাজ্যে অনুপ্রবেশকারীদের ঢুকিয়ে ভোটব্যাংক বাড়াচ্ছে বাম ফ্রন্ট। তিনি সংসদে এ নিয়ে ক্ষোভ ঝেড়েছিলেন। সেই মমতা আজ অন্য কথা বলছেন। কিন্তু রাজ্যবাসীর অনেকেই মমতার যুক্তি মানছেন না। তাঁরা বলেছেন, এই আইনে তো কাউকে তাড়ানোর কথা বলা হয়নি। তবে কেন মমতা আইনের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন?
এ নিয়ে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা ও বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের পাল্টাপাল্টি বাগ্যুদ্ধ চলছে। এতে রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
মমতা বলেছেন, রাজ্যে সিএএ কার্যকর করতে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে দিলীপ ঘোষ বলেছেন, এই আইন কার্যকর করে উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে।
এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে একসময় মমতার পাশে থাকা মতুয়াদের একটা বড় অংশ এখন বিজেপির পাশে দাঁড়িয়েছে। মতুয়ারা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন দিদি এভাবে ঘুরে গেলেন? কেনই-বা তাঁদের নাগরিকত্বের বিরোধিতা করছেন তিনি।
যদিও মমতা বারবার বলছেন, মতুয়ারা তো এই দেশেরই নাগরিক। তাঁদের আবার কেন নতুন করে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে? এটা তো বিজেপির ষড়যন্ত্র। বিজেপি এই রাজ্যে ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছে। এই ষড়যন্ত্র রোধ করা হবেই।
তৃণমূল-বিজেপি লড়াইয়ের মাঝে বিজেপি নেতা শঙ্কু দেব পান্ডা নতুন করে বলেছেন, মমতা যা করছেন, তাতে রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ, সিএএ নিয়ে আন্দোলনের জেরে রাজ্যের রাজনীতি অশান্ত হয়ে পড়েছে। ভেঙে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা। প্রতিদিনই আইনের পক্ষে-বিপক্ষের আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষ হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশও হিমশিম খাচ্ছে।
মমতা যেমন অনড় সিএএ-এনআরসি বাতিলের দাবিতে, ঠিক তেমনই বিজেপিও অনড় তা কার্যকরে। ফলে রাজ্যে সিএএ ও এনআরসি নিয়ে মুখোমুখি দুই পক্ষ। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে, তবে কি রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন অত্যাসন্ন?
বিজেপি নেতা শঙ্কুদেব পান্ডা বলেছেন, ‘ভারতবর্ষের কোন আইন মানেন না মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাহলে তিনি কি একটি আলাদা ভূখণ্ড চাইছেন? বিজেপি এই রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন চায় না। কিন্তু মমতা যেভাবে একের পর এক কেন্দ্রীয় নীতি ও আইনের বিরোধিতা করে চলছেন, তাতে হয়তো কোন দিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখবেন, বাংলায় রাষ্ট্রপতির শাসন জারি হয়ে গেছে।’
গত রবিবার উত্তর চব্বিশ পরগনার নীলগঞ্জে বিজেপি আয়োজিত এক সভায় এসব কথা বলেন শঙ্কুদেব পান্ডা। শঙ্কুদেবের এই কথা বঙ্গে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির ইঙ্গিত বহন করে।
এখন দেখার পালা, কোথার জল কোথায় গড়ায়। শেষ পর্যন্ত কী হয়!
সূত্র: প্রথম আলো
No comments:
Post a Comment