" ফিরে এসো চাকা " কবি বিনয় মজুমদার ফেরাতে চেয়েছিলেন সুসভ্যতার চাকা । ফিরে এসো চাকা বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের স্রষ্টার অর্জিত সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার চুরি হল। সুসভ্যতার চাকা ফিরুক না ফিরুক চুরির চাকা ফিরল। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল চুরির পর চুরি হল কবি বিনয় মজুমদারের সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার। সোমবার সন্ধ্যায় চুরির ঘটনা প্রথম প্রকাশ্যে আসে।
সালটা ছিল ২০০৪ । কবিগুরুর নোবেল চুরির পর তোলপাড় হয়ে যায় গোটা বিশ্বে । সৃষ্টিকর্তাদের অর্জিত পুরস্কারে চোরের নজর পড়েছে। সভ্যতাকে এক লহমায় দাঁড় করিয়ে দেয় এমন প্রশ্নের সামনে। কবি বিনয় মজুমদারের সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার চুরির পর বাঙালির সভ্যতাকে ফের একবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল তামাম বিশ্বের সামনে । সোমবার সন্ধ্যায় লাইব্রেরি খুলতে গিয়ে ঘরের ছিটকানি ও আলমারির তালা ভাঙ্গা নজরে আসে । কর্তৃপক্ষ গ্রন্থাগারের ভেতরে ঢুকে দেখেন আলমারি ভাঙা এবং শুধু মাত্র বিনয় মজুমদারের সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার নিয়ে পালিয়েছে চোর। সাথে সাথে খবর দেওয়া হয় গাইঘাটা থানায়। পুলিশ এসে তদন্ত শুরু করে।
গ্রন্থাগারের দুই সম্পাদক জানান, রবিবার রাত নটা নাগাদ বন্ধ করে তারা বাড়ি যান। গোটা ঘটনা তদন্ত করে দেখছে গাইঘাটা থানা। কবির মৃত্যুর কয়েক বছর আগে তাকে দুটি বড় পুরস্কার দেওয়া হয়, রবীন্দ্র পুরস্কার এবং একাডেমি পুরস্কার। তিনি দীর্ঘ রোগভোগের পরে ২০০৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
কবি বিনয় মজুমদার মায়ানমারের মিকটিলা জেলার টোডো নামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম বিপিনবিহারী মজুমদার, মায়ের নাম বিনোদিনী। তারা ছিলেন ছয় ভাই-বোন এবং তিনি ছিলেন সবার ছোট। তার ডাক নাম মংটু। "ফিরে এসো চাকা" ছিল তার অতি জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ। এলিট কবিরা তাকে ‘পাগল’ আখ্যা দিলেও পঞ্চাশের কবিতায় তিনি উথাল-পাতাল পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ পরবর্তী উজ্জ্বল কবি হিসেবে বিনয়কে গণ্য করা হয় মূলতঃ কবিতায় গণিত ও বিজ্ঞানের যুক্তি উপস্থাপন এবং স্বতন্ত্র কাব্যভাষা নির্মাণের কারণে।
১৯৪৮ সালে দেশভাগের সময় কবি বিনয় মজুমদার সপরিবারে কলকাতায় চলে আসেন। এখানে, ১৯৪৯ সালের জানুয়ারি মাসে তাকে কক্রিক রো-তে অবস্থিত মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউট (বউবাজার ব্রাঞ্চ)-এ নবম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হওয়ার পরে, ১৯৫১ সালে আইএসসি (গণিত) পড়ার জন্য প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৭ সালে তিনি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে পাশ করেন। শোনা যায়, তার পাওয়া নম্বর আজও কেউ নাকি ভাঙতে পারেন নি। ১৯৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে, অর্থাৎ ছাত্রজীবন সমাপ্ত হওয়ার কয়েকমাস পরেই এনবিএ থেকে প্রকাশিত হয় "অতীতের পৃথিবী" নামক একটি অনুবাদ গ্রন্থ। এই বছরেই গ্রন্থজগৎ থেকে বের হয় তার প্রথম কাব্য গ্রন্থ 'নক্ষত্রের আলোয়'। বৌলতলি হাই-ইংলিশ স্কুলের ম্যাগাজিনে প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। ত্রিপুরা গভর্নমেন্ট কলেজে অল্পকিছুদিন শিক্ষকতা করার পর স্থির করেন শুধুই কবিতা লিখবেন। লেখা শুরু করেন 'ফিরে এসো চাকা'। এই সময় তিনি দুর্গাপুর স্টিল প্লান্টেও কিছুদিন কাজ করেন। তখন থেকেই মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যায়। ১৯৬৬ সালে লিখতে শুরু করেন 'আঘ্রানের অনুভূতিমালা' ও 'ঈশ্বরীর স্বরচিত নিবন্ধ'। বিশটি কাছাকাছি কাব্যগ্রন্থ লিখেছিলেন, যার মধ্যে "ফিরে এসো চাকা" তাকে সবচেয়ে বেশি খ্যাতি দিয়েছে।এছাড়াও নক্ষত্রের আলোয়, গায়ত্রীকে, অধিকন্তু, ঈশ্বরীর, বাল্মীকির কবিতা, আমাদের বাগানে, আমি এই সভায়, এক পংক্তির কবিতা, আমাকেও মনে রেখো-ইত্যাদি রচনা করেছিলেন। ১৯৬২-৬৩ সালে বিনয় মজুমদার হাংরি আন্দোলন-এ যোগ দেন এবং তার কয়েকটি কবিতা হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত হয় । পরবর্তীকালে, অর্থাৎ ১৯৬৩ সালের শেষ দিকে তিনি শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়-এর কার্যকলাপে বিরক্ত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে একটি হাংরি বুলেটিন প্রকাশ করে কলকাতা কফিহাউসে বিলি করার পর হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করেন ।
No comments:
Post a Comment