দেবশ্রী মজুমদার, বীরভূম, ১৩ অক্টোবরঃ “ঘোষগ্রামে লহ্মী, উপলাই বর “ প্রচলিত লোকমুখে। ঘোষগ্রামের পাশেই উপলাই। ওই গ্রামে কোন এক সময় বাস করত দয়াল ঘোষ। একদিন তিনি ঋণভারে জর্জরিত হয়ে গ্রাম ছাড়ার কথা ভাবেন। ঘরে ছিল কয়েক টিন ধান। ওই সম্বল করেই বেড়িয়ে পড়বেন বলে মনস্থির করেন। তাই মাপতে লাগলেন সেই ধান। গোটা রাত্রি মেপেও শেষ করতে পারেন নি। মা লহ্মীর কৃপায় তাঁর গোটা উঠোন ধানে ছাপিয়ে গেছে। তাঁর যাওয়া আর হয় নি। মায়ের স্বপ্নাদেশে ঘোষগ্রামে লহ্মীর সেবক হন। সেই কিংবদন্তী আজও লোকমুখে।
কোলকাতায় যেমন দুর্গাপুজো, বারাসাত ও নৈহাটীতে যেমন কালীপুজো বা চন্দন নগরে যেমন জগধাত্রী পুজো, ঠিক তেমনি বীরভূমের ময়ুরেশ্বর থানার ঘোষগ্রামে কোজাগরী লহ্মীপুজো। এখানে একমাত্র লহ্মী পুজোয় বড় আকারে পালিত হয়। গোটা গ্রাম ও আশেপাশের মানুষ এই কোজাগরী পুজোকেই একমাত্র প্রধান উৎসব বলে বংশ পরম্পরায় মেনে আসছেন।
রামপুরহাট মহকুমার দক্ষিণ দিকে ঘোষগ্রাম। আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগের ইতিহাস এই ঘোষ গ্রামের। নগেন্দ্র বসু সিধান্ত বারিধির বঙ্গের জাতীয় ইতিহাসের কায়স্থ খণ্ডে উল্লেখ আছে—“ ঘোষগ্রামে লহ্মী মাতা বিরাজয়, বহু দেবোত্তর ভূমি আছয়ে উঁহায়। পায়োসান্ন ভোগ বারোমাস”। বারোমাসই এখানে লহ্মীর পুজো হয়। কারন গোটা দেশে এই একটি মা লহ্মীর গ্রাম ঘোষ গ্রাম। লহ্মীমাস পৌষ মাসের প্রতি বৃহস্পতিবার ঘোষগ্রামে মেলা হয়। কোজাগরী লহ্মী পুজোর দিন গোটা দিন পুজো হয়। সন্ধ্যেয় হয় খিঁচুড়ির ভোগ। এদিন বিশাল মেলা বসে। বহু ভক্ত সমাগম হয়। স্মেরাণনা (হাস্যময়ী) দারুমূর্তী মা লহ্মীর। তাঁর ডান দিকে কন্যা সন্তান ধন। বামদিকে পুত্র সন্তান কুবের। মা কুবেরের হাতে তুলে দিচ্ছেন চালের ছড়া বা গাই।
কথিত বাংলার শূর বংশীয় রাজা আদিশূর ৭৩২ মতান্তরে ১০৪২ খ্রীষ্টাব্দে যুক্তপ্রদেশ বর্তমানে উত্তর প্রদেশ থেকে পাঁচ জন বাহ্মণ ও পাঁচজন কায়স্থ আনেন। তাঁদের মধ্যে সোমঘোষকে ঘোষগ্রাম সহ ১২৭ টি গ্রাম দান করেন। তিনিই প্রথম লহ্মীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। একটিও ঘোষ ঘোষগ্রামে নেই, তবুও নামটি থেকে গেছে। এরপর ১৮০৫-১০ খ্রীষ্টাব্দে কান্দির রাজা কৃষ্ণ চন্দ্র সিং ওরফে লালা বাবু ওই মন্দির পূনর্নিমান করেন, বলে জানান বিশিষ্ট গবেষক প্রবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও অধীর কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। এই মন্দিরে দুটি কক্ষ। চূন সুড়কির গাঁথনি। লহ্মী মূর্তির পাশে ডান দিকে বিরাজ করছেন রাম, লহ্মণ, সীতা ও হনুমান। মন্দিরের কাছে দেবীকুণ্ড। লহ্মীতলার বটবৃক্ষের নীচে পাল যুগের বহু নিদর্শন আছে। গুপ্ত যুগের এক অষ্ট ধাতুর মূর্তি চুরি যায় এই মন্দির থেকে বহু দিন আগে। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এই ঘোষ গ্রামে কামদেব ব্রহ্মচারী সিদ্ধিলাভ করেন। তিনি তারাপীঠে তন্ত্র মতে সিদ্ধিলাভ করেন। তাঁরই নামে তারাপীঠের কাছে কামদেবপুর গ্রাম আজও সেই সময়ের নীরব সাক্ষী।
আরেক কিংবদন্তী আছে,এই লহ্মীপুজো নিয়ে সেই সময় দয়াল ঘোষ নামে গ্রামের এক কৃষক চাষের কাজ করছিলেন। সঙ্গে ছিল তার মেয়ে। কাঁদরের (খাল) জলে একটি পদ্মফুল ভাসতে দেখে তার মেয়ে সেই ফুল নেওয়ার জন্য বায়না ধরে। দয়াল বাবু ফুলটি তুলতে কাঁদরের জলে নামলেও, তিনি তা তুলতে ব্যার্থ হন। তিনি যতই ফুলটির কাছে যান, ততই ফুলটি দূরে সরে যায়। সেদিন রাত্রে সেই কৃষক স্বপ্নে দেবী লহ্মীর দর্শন পান। পরের দিন মহাধূম ধামে মা লহ্মী বা মা কমলার পুজো হয়। সেই শুরু। আজও মহাধূমধামে মা লহ্মীর পুজো হয়ে আসছে। এখানে দেবীমূর্তি মা স্মেরাণনা (হাস্যময়ী) দারুমূর্তি। তাঁর ডান দিকে কন্যা সন্তান ধন।
বাম দিকে পুত্র সন্তান কুবের। মা কুবেরের হাতে তুলে দিচ্ছেন চালের ছড়া বা গাই। আগে নাকি এখানে খোসা ছাড়া চালের ছড়া পাওয়া যেত। সেই ছড়া দেখতে আজও এখানে লোক ভিড় করে। সকলেই রাজা কৃষ্ণ চন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত লহ্মীপুজোয় মেতে ওঠেন। প্রবোধ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, আশ্বিন সংক্রান্তির দিন মা লহ্মী পৃথিবী পরিক্রমায় বের হন ধন সঞ্চয়ের জন্য। তখন থেকে চারদিন ২রা কার্তিক পর্যন্ত মন্দির গৃহ বন্ধ থাকে। সেই সময় পুজো ভোগ বন্ধ থাকে। শুধু ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলে। চার দিন পর মন্দির খোলা হয়। খড়ের দড়ি সেই প্রদীপ শিখা থেকে জ্বালিয়ে বিভিন্ন গৃহে একই ভাবে খড়ের দড়ি জ্বালানো হয়। তারপর তার ছাই মাঠের মধ্যে শস্য কামনায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মন্ত্র বলা হয়ঃ আশ্বিন গেল, কার্তিক এল। ছোট, বড় ধান গর্ভে এল।
গ্রামের বাসিন্দা ও সেবায়েত গুরুশরণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, গ্রামের আরাধ্যা মা লহ্মী। তাই গ্রামে একমাত্র লহ্মী পুজো হয়। অন্য পুজো হয় না। কারো বাড়িতেও আলাদা করে লহ্মীপুজো হয় না। পুজো ঘিরে গ্রামে বিশাল মেলা বসে। হাজার হাজার পূণ্যার্থীর এদিন সমাগম ঘটে গ্রামে। ১৩২৪বঙ্গাব্দের ১১ চৈত্র নতুন মন্দিরে দ্বারোদঘাটন করেন কৃষি মন্ত্রী আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৩৫৬ বঙ্গাব্দে মায়ের নব কলেবর হয়। ১০৮ ক্ষীরের নাড়ু আহুতি দেওয়া হয় যজ্ঞে। রকমারি কড়ির মেলা হয় বসে ঘোষগ্রামে। পুরুষ পুলিশের পাশাপাশি প্রচূর মহিলা পুলিশ ও মোতায়েন করা হয়। মন্দির থেকে তিন কিমি দূরে পুলিশ পিকেট বসানো হয়। গোটা রাস্তায় থাকে পুলিশ।
পি/ব
No comments:
Post a Comment