দেবশ্রী মজুমদার, নলহাটি, ১২ অক্টোবর: তারাপীঠে যখন গ্রামীণ মেলা হারিয়ে যেতে বসেছে, ঠিক তখনই বীরভূমের আকালীপুরের মেলা পরিসর বৃদ্ধি হচ্ছে। তবে চর্তুদশী পুজোর প্রাচীন রীতি কিছুটা বদল হয়েছে। মেষ ও মোষের বদলে বলি দেওয়া হয় কুমড়ো ও আটার মোষ। কমানো হয়েছে ছাগ বলি। প্রাচীন রীতি মেনেই এই মেলা সম্প্রীতির মিলন মেলায় পরিণত হচ্ছে।
প্রায় ২৩২ বছর আগে আকালীপুর গ্রামের গুহ্যকালীকে লক্ষী রুপে পুজো এবং মেলার সুচনা করেন মহারাজ নন্দকুমারের ছেলে গুরুদাস রায়। আনুমানিক ১৭০৫ সালে মহারাজ নন্দকুমার জন্মগ্রহণ করেন নলহাটি থানার ভদ্রপুর গ্রামে। তার পাশের গ্রাম আকালীপুর। ১৭৭৫ সালের মে মাসে মোহন প্রসাদের মিথ্যা জালিয়াতির অভিযোগে সুপ্রীম কোর্টের বিচারক তাঁর ফাঁসির আদেশ দেন। তার ২২ দিন পর ৮ জুলাই নন্দকুমারকে কলকাতার ময়দানে ফাঁসি দেওয়া হয়। ফলে ইচ্ছে থাকলেও তিনি গুহ্যকলীর পুজো বা মেলার সূচনা করে যেতে পারেননি। বাবার মৃত্যুর পর গ্রামেই থাকতেন তার বংশধররা।
সেই থেকে গ্রামের গুহ্যকালী মন্দিরে চত্বরে এই মেলা আজও চলে আসছে। পুজোর আগে সেসময় মন্দিরের সামনে একটি করে মেষ ও মোষ বলি দেওয়া হত। বছর ১০-১২ আগেই তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কোন এক বছর বলির কিছুক্ষণ আগে একটি মোষ শাবকের মৃত্যু হয়েছিল। সেই থেকেই মেষের বদলে কুমড়ো আর মোষের বদলে আটাকে দুধ দিয়ে মাখিয়ে ফুট দুয়েকের মোষ তৈরি করে বলি দেওয়া হয়। কমেছে ছাগ বলিও। একসময় যেখানে ৬০-৭০ টি ছাগ বলি দেওয়া হত এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ - ২০ তে। তবে প্রাচীন রীতি মেনে মা গুহ্যকালীর তিনটি দরজার সামনে প্রথমে তিনটি ছাগ বলি দেওয়া হয়।
তারপর মূল বলির জায়গায় একে একে বলি দেওয়া হয়। সেই প্রথা আজও মেনে চলেন নন্দ কুমারের বর্তমান বংশধরেরা। মহারাজার দৌহিত্র ভবানী শঙ্কর রায় বলেন, “এই মেলা হচ্ছে বিজয়ার মেলা। এককথায় মিলন মেলা। এখানে সব ধর্মের মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এমেলা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি নির্দশন। বিজয়ার পর এই মেলা প্রাঙ্গনে সব ধর্মের মানুষ একে অপরের সঙ্গে আলিঙ্গন করেন।
বিজয়ার শুভেচ্ছা জানান।’ মন্দিরের সেবাইত দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘বছরের এই একটি দিন মা কে আমরা লক্ষী রুপে পুজো করি। এদিন ভোরে মা কে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় ও গয়না পড়ানো হয়। মায়ের কাছে কামনা করি সমস্ত মানুষ যেন সারাটা বছর সুখ শান্তিতে থাকে।’ মেলা দেখতে ভিড় জমান ভদ্রপুরের তাপস সাহা, সিমলান্দি গ্রামের অরুপ প্রামণিক, মোস্তফাডাঙার চাঁদ মহম্মদরা। তাঁরা বলেন, ‘মেলার আয়তন বেড়েছে। ভিড় বেড়েছে ভক্তদের। আমরা এই মেলাকে মিলন মেলা হিসাবে উদযাপন করি।‘
পি/ব
No comments:
Post a Comment