সভ্যতার রহস্যময় আদিভূমি মিশর। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে মিশরকে কেন্দ্র করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মিশরকে কেন্দ্র করে প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান অনেকটা কমে এসেছিল। এক সময় অনেকে মনে করতেন- নতুন করে আর বড় কিছু আবিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা কম। কেননা, গত ৩০০ বছর অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। যদিও ইজিপ্টলোজির অনেক পণ্ডিত সব সময় বলে এসেছেন, যা আবিস্কার হয়েছে তার চেয়েও অনেক কিছু অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। গত দুই বছর ধরে মিশর সরকার ব্যাপক পরিসরে প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান শুরু করছে। প্রত্নতাত্ত্বিক মিশর কল্পনা করলে সবার আগে চলে আসে লুক্সোর’র কথা। লুক্সোরকে বলা হয় পৃথিবীর প্রত্নতাত্ত্বিক রাজধানী।
কিংস ভ্যালি, কুইনস ভ্যালি, কর্নাট মন্দিরসহ নীলনদের তীর বরাবর পুরোটাই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে ভরপুর। অনেক আর্কিওলজিস্ট জীবন পার করে দিয়েছেন লুক্সোরের ছোট একটি পাহাড় নিয়ে গবেষণা করে। মিশর সরকার তাই তাদের বড় বাজেটের অভিযানটাই লুক্সোরের জন্য বরাদ্দ করেছিল। তার ফলাফল মিলতে শুরু করেছে। গত ৯ ডিসেম্বর মিশরের প্রত্নতাত্ত্বিক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খালিদ আল আনানী লুক্সোরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের নতুন আবিষ্কারের ঘোষণা দেন। অল্প কয়জন নির্বাচিত অতিথি এবং বিদেশি সাংবাদিকদের নতুন আবিষ্কার হওয়া সাইটে বিশেষ প্রহরায় নিয়ে যাওয়া হয়।
লুক্সোর শহরের পশ্চিম তীর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে একটি কবর আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে কবরটি পিরামিডের মতো। কবরটি মিশরের দেবতা আমুনের স্বর্ণকার ও তার পরিবারের। এখানে বেশ কয়েকটি মমি ও স্বর্ণের অনেক তৈজসপত্র আবিষ্কার করা হয়েছে। কবরটি বড় একটি পাহারের অংশ মাত্র। তবে জেনে রাখা দরকার মিশরের প্রাচীন কবরগুলো ছিল প্রাসাদের মতো। সেখানে জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ সমাধিস্থ করা হতো।
আর্কিওলোজিকাল গবেষকরা মনে করছেন, পুরো এলাকাটিতে গড আমুনের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের অনেক কবর পাওয়া যাবে। কবরের বয়স আনুমানিক ৩৫০০ বছর। সবচেয়ে আশ্চার্য হতে হয় কবরের আশপাশের দেয়ালের হায়ারোগ্লিফি দেখে। এত সুন্দর পেইন্টিং ও রঙ যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
একই দিন একটি মন্দির পর্যটকদের জন্য প্রথম বারের মতো খুলে দেওয়া হয়। শিলালিপি অনুযায়ী মন্দিরের নাম আমুনেথের কুইয়ে বিজয় মন্দির। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হচ্ছে, পুরো মন্দিরটি অজ্ঞাত কারণে ৩ হাজার বছর আগেই মিশরের অন্য একজন দেবতা (মিশরের সম্রাট নিজেদের দেবতা বলতেন) ধ্বংস করে মাটিচাপা দেন। ১৯৬০ সালে পোলিশ সরকারের অর্থায়নে প্রথম ওই এলাকায় খননকার্য পরিচালনা করা হয়। তখন কেউ ধারণাও করতে পারেনি, এমন একটি পরিপূর্ণ প্রাসাদ মাটির নিচে চাপা থাকতে পারে। এই প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটটি পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল ও দীর্ঘ সময় ধরে চলা প্রকল্প।
দীর্ঘ ৫৭ বছর পর সাইটটি পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। ভেঙে ফেলা অংশগুলো পুনর্নির্মাণের পর সামনের অংশ খুলে দেওয়া হয়েছে। ভেতরে আরো গবেষণা চলমান রয়েছে। এই মন্দিরের দেয়ালের হায়ারোগ্লিফি নতুন এক সভ্যতার বার্তা দিচ্ছে। এ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা শুরু হয়েছে।

No comments:
Post a Comment