কলকাতা: এবার থেকে বাংলাদেশে যেতে হলে এ দেশের নাগরিকদের ‘ভিসা’র জন্য ফিজ গুনতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রতিটি ভিসার জন্য প্রসেসিং ফিজ বা সার্ভিস চার্জ বাবদ প্রত্যেক নাগরিকেই দিতে হবে টাকা। যদিও প্রাথমিক ভাবে কলকাতাস্থ বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের (বিডিএইচসি) নতুন ‘ভিসা অ্যাপলিকেশন সেন্টার’ থেকে এ দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশি ভিসা সংগ্রহ করতে হলে ওই ফিজ দিতে হবে। পরবর্তীতে প্রয়োজনে কলকাতাস্থ বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনারের আওতাধীন দেশের অন্য শহরগুলি (ওড়িশা, বিহার, ঝাড়খন্ড, সিকিম, ছত্তিশগড়)-তেও ‘ভিসা অ্যাপলিকেশন সেন্টার’ চালু করতে চায় ওই বেসরকারি সংস্থা।
চলতি বছরের ৭ অক্টোবর কলকাতা বিডিএইচসি এবং দিল্লী ভিত্তিক ‘ডিউ ডিজিটাল বিডি প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে ওই বেসরকারি সংস্থার মধ্যে এই মর্মে একটি চুক্তিও সম্পাদিত হয়েছে, যা বহাল থাকবে আগামী পাঁচ বছরের জন্য। ওই চুক্তিতে বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের হয়ে স্বাক্ষর করেন উপ-হাইকমিশনার তৌফিক হাসান এবং স্বাক্ষী হিসাবে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের প্রথম সচিব (রাজনৈতিক) মোহাম্মাদ সাইনুল কাদের। অন্যদিকে ডিউ ডিজিটাল বিডি প্রাইভেট লিমিটেডের হয়ে স্বাক্ষর করেন ওই সংস্থার ডিরেক্টর শিভাজ রাই এবং স্বাক্ষী হিসাবে স্বাক্ষর করেন পাঞ্জাব ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস, কলকাতার ডিরেক্টর পীযূষ গুপ্তা।
বিশ্বস্ত সূত্রে খবর, খুব তাড়াতাড়ি কলকাতার কাছেই সল্টলেকের সেক্টর ফাইভে ওই নতুন ‘ভিসা অ্যাপলিকেশন সেন্টার’- এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হতে চলেছে। সেক্ষেত্রে আগামী ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবসের দিনই সম্ভবত চালু হতে হতে সেটি। আর বিষয়টি সামনে আসতেই পড়ে গেছে শোরগোল।
বর্তমানে বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য কোনও নাগরিককেই ভিসা ফিজ দিতে হয় না। দিল্লী, মুম্বাই, চেন্নাই, ত্রিপুরা সহ দেশের একাধিক বাংলাদেশি মিশন থেকে এই ভিসা দেওয়া হয়ে থাকে। কলকাতার ক্ষেত্রে ৯, নম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরণীতে অবস্থিত বাংলাদেশ উপ-হাই কমিশন কার্যালয় থেকে নিয়মনীতি মেনে বাংলাদেশ যাওয়ার ভিসা প্রদান করা হয়। সেক্ষেত্রে গত ৫০ বছর ধরে বাংলাদেশের প্রথম বিদেশি মিশন এই কলকাতাতে কোন ভিসা ফিজ ছাড়াই ভারতীয়দের ক্ষেত্রে এই পরিষেবা চালু রয়েছে। কিন্তু বেসরকারি সার্ভিস প্রোভাইডার নিয়োগের পর দীর্ঘদিনের এই নীতিতে বিরাট পরিবর্তন আসতে চলেছে। সেক্ষেত্রে সার্ভিস চার্জ হিসাবে প্রত্যেক ভারতীয়দের ভিসা প্রতি ৭০০ টাকা ফিজ দিতে হবে, সাথে দিতে হবে ভারত সরকারের ঘোষিত ১৮ শতাংশ ‘গুডস এন্ড সার্ভিস ট্যাক্স’ (জিএসটি)।
এছাড়াও ঘুরিয়ে আরও কিছু অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হতে পারে ভিসার আবেদনকারীদের। সল্টলেকের সেক্টর-৫ এ চালু হতে যাওয়া এই নতুন ‘ভিসা অ্যাপলিকেশন সেন্টারে’ প্রতি কপির প্রিন্ট আউট-১৫ টাকা, এক কপি ফটোকপির খরচ ১০ রুপি, ৪ কপি পাসপোর্ট ফটো তৈরির জন্য খরচ ২০০ টাকা, ভিসার ফর্ম ফিলাপের জন্য দিতে ৩০০ টাকা, ক্যুরিয়ার চার্জ বাবদ ৪০০ টাকা, ব্যক্তিগত লাউঞ্জ ব্যবহারের জন্য ৩৫০০, ঘরে বসে ভিসা পেতে লাগবে ৪ হাজার টাকা।
সোমবার থেকে শুক্রবার- সপ্তাহে পাঁচদিন সকাল ৯ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত এই ‘ভিসা অ্যাপলিকেশন সেন্টার’ খোলা থাকবে। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক এই ভিসা সেন্টারে থাকছে পর্যাপ্ত পরিমাণ অটো কিউইং মেশিন, সুবিশাল প্রতীক্ষালয়, ভিআইপি লাউঞ্জ, স্নাকস কর্ণার, টেলিভিশন স্ক্রীন, বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র সম্পর্কে পর্যটকদের অবগত করার জন্য থাকবে ডিসপ্লে বোর্ড, সিসিটিভি নজরদারি, অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা সহ আরও অনেককিছু। কোভিড স্বাস্থ্য বিধি মেনেই চলবে সমস্ত কাজকর্ম। ভিসা সেন্টারের শীর্ষে থাকবেন একজন অপারেশন ম্যানেজার বা সুপারভাইজার- যিনি ভিসা সম্পর্কিত সমস্ত কাজ খতিয়ে দেখা ও বাংলাদেশ মিশনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ স্থাপন করবেন।
যদিও বাংলাদেশ ভ্রমণে ভিসার জন্য সার্ভিস চার্জ বাবদ নতুন এই খরচের আদৌ খুশি নয় এ দেশের পর্যটকরা। পরিসংখ্যান বলছে কলকাতাস্থ বাংলাদেশি উপ-হাইকমিশনের ভিসা অফিস থেকে প্রতি বছর প্রায় দেড় লাখ বাংলাদেশি ভিসা প্রদান করা হয়ে থাকে। ভ্রমণ পিপাশু বাঙালি তথা ভারতীয়দের বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে দেশের পর্যটন বিভাগের তরফে বিভিন্ন প্রকল্পও নেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে কলকাতার ভিসা অফিস থেকে ভিসা আবেদনাকারীর সংখ্যা কমতে পারে।
জানা গেছে, যে বেসরকারি সংস্থাকে সার্ভিস প্রোভাইডারের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে- সেই ‘ডিউ ডিজিটাল বিডি প্রাইভেট লিমিটেড’ এর রেজিস্টারড অফিস রয়েছে সি-৪, কমার্সিয়াল কমপ্লেক্স, সফদরজং ডেভলপমেন্ট এরিয়া, দিল্লীর ঠিকানায়। কিন্তু অভিযোগ, সেটি একটি ভুঁইফোঁড় সংস্থা এবং আদতেও তাদের এই ধরনের কাজের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতাই নেই, নেই লোকবল ও অবকাঠামো।
শুধু তাই নয়, ওই সংস্থার বরাত পাওয়ার ক্ষেত্রেও একটি বড়সড় দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এমনও অভিযোগ উঠেছে যে বিনা টেন্ডারেই মাত্র ১ লাখ টাকা মূলধন বিনিয়োগ করেই কয়েক কোটি টাকার বরাত পেয়েছে ওই সংস্থাটি। যদিও এব্যাপারে উপ-হাইকমিশনার তৌফিক হাসানকে ফোনে সংযোগ করার চেষ্টা হলেও তিনি তাতে সাড়া দেননি।
No comments:
Post a Comment