কুমিল্লার নানুয়ার দিঘীর পাড়ের পূজা মণ্ডপে কোরআন শরীফ রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে ইকবাল হোসেন নামের এক যুবককে। এই ইকবালকে গ্রেপ্তার করতে গত কয়েকদিন ধরে চলছে জোর অভিযান।
ইকবালের সহযোগী হিসাবে অন্তত চারজন এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মনে করছে ইকবাল গ্রেপ্তার হলেই এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
দুর্গা পূজার সময় উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যেই গত ১৩ই অক্টোবর ভোরে বাংলাদেশের কুমিল্লার নানুয়ার দিঘীর পাড়ের পূজা মণ্ডপে কোরআন পাওয়ার পরেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ওই মন্ডপের পাশাপাশি সেখানকার অন্যান্য পুজো মণ্ডপ থেকে শুরু করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর নোয়াখালী চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়।
যেখান থেকে সাম্প্রদায়িক-সহিংসতা সূত্রপাত সেই মণ্ডপে কীভাবে উত্তেজনা শুরু হল এবং মূল মণ্ডপের বাইরে পুজোর থিম হিসেবে রাখা হনুমান জির মূর্তির ওপর কোরআন কিভাবে এলো সে বিষয়ে মঙ্গলবার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউজ বাংলা।
পূজার আয়োজন এলাকাবাসী তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ সহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার আগের রাতে আড়াইটে পর্যন্ত মন্দিরের পূজা সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতি ছিল। এরপর বুধবার সকাল সাড়ে ছ'টার দিকে দুজন নারী ভক্ত মণ্ডপে এসে হনুমান জির মূর্তিতে প্রথম কোরআন শরীফটি দেখতে পান।
রাত আড়াইটা থেকে ভোর সাড়ে ছ'টার মধ্যে কোনও এক সময়ে স্থানীয় এক ব্যক্তি কোরআনটি রেখে যায় মণ্ডপে। সেই সময় হনুমান জির হাতের গদাটি সরিয়ে নেয় সে। তার চলে যাওয়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে ওই এলাকারই কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজে। এই ধরনের একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পেয়েছে নিউজ বাংলা। এতে দেখা যায় কোরআন রাখার পর হনুমানের মূর্তির গদা কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে প্রধান অভিযুক্ত ওই ব্যক্তি। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে সময়টি তখন রাত সোয়া তিনটা নাগাদ।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য এবং নিজস্ব অনুসন্ধানে নিউজ-বাংলা নিশ্চিত হয়েছে, গদা কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাওয়া ওই ব্যক্তির নাম ইকবাল হোসেন। ৩০ বছর বয়সি ইকবাল কুমিল্লা নগরীর ১৭নং ওয়ার্ডের দ্বিতীয় মুরাদপুর লস্করপুর এলাকার নূর আহমেদ আলমের ছেলে। নুর আলম পেশায় মাছ ব্যবসায়ী।
পরিবারেরও চাই ইকবালের শাস্তি
ইকবালের মা আমেনা বেগম নিউজ বাংলাকে জানান, তার তিন ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে ইকবাল সবার বড়। তিনি জানান, ইকবাল ১৫ বছর বয়স থেকেই নেশা করা শুরু করে। ১০ বছর আগে সে জেলার বরুড়া উপজেলা বিয়ে করে। ওই ঘরে তার এক ছেলে রয়েছে। পাঁচ বছর আগে ইকবালের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। তারপর ইকবাল চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়া বাজার এলাকার কাদৈর গ্রামে আরেকটি বিয়ে করে। এই সংসারে তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
আমেনা বেগম নিউজ বাংলাকে বলেন, 'ইকবাল নেশা করে পরিবারের সদস্যদের ওপর অত্যাচার করত। বিভিন্ন সময় রাস্তাঘাটেও নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াতো।'
ইকবাল মাজারে মাজারে থাকতে ভালবাসত জানিয়ে তিনি বলেন, 'সে বিভিন্ন সময় আখাউড়া মাজারে যেত। কুমিল্লার বিভিন্ন মাজারেও তার যাতায়াত ছিল।'
পঞ্চম শ্রেণী পাস ইকবালের সঙ্গে ১০ বছর আগে বন্ধুদের মারামারি হয়। এ সময় তারা ইকবালকে পেটে ছুরিকাঘাত করে। তখন ইকবাল অপ্রকৃতস্থ আচরণ শুরু করে বলে দাবী করে তার পরিবার। আমেনা বেগম জানান তিনি স্থানীয় কাউন্সিলর এর মাধ্যমে জানতে পেরেছে, ইকবাল পূজা মণ্ডপ থেকে হনুমান জি'র গদা সরিয়ে কোরআন রেখেছে। আমেনা বলেন, 'ইকবাল কারও প্ররোচনায় এমন কাজ করতে পারে, তার বোধবুদ্ধি খুব একটা নেই। ছেলে সত্যিই যদি অন্যায় করে, তাহলে যেন তার শাস্তি হয়।'
ইকবালের ছোট ভাই রায়হান নিউজ বাংলাকে জানান, ইকবালকে খুঁজতে পুলিশকে তারাও সহায়তা করেছেন।
১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সৈয়দ সোহেল নিউজ-বাংলাকে বলেন, 'আমি দশ বছর ধরে ইকবালকে চিনিসে রংয়ের কাজ করতো মাঝে মাঝে নির্মাণকাজের সহযোগী হিসেবে কাজ করত। ইয়াবা সেবন করায় প্রায়ই তাকে নিয়ে অনেক দেনদরবার করতে হতো।'
ইকবালের কর্মকাণ্ডে এলাকাবাসীও বিরক্ত বলে জানান তিনি। সোহেল বলে, 'আমার দৃঢ় বিশ্বাস ইকবালের মানসিক অসুস্থতাকে কাজে লাগিয়ে তৃতীয় কোনও পক্ষ কাজটি করেছে।'
কোরআন রাখার পর যেভাবে ছড়ানো হয় উত্তেজনা
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নিউজ বাংলাকে জানান, 'মণ্ডপে কোরআন রাখায় যে চক্রটি জড়িত, ইকবাল তাদের একজন। সে কোরআন রাখার পর ভোরে আরেক অভিযুক্ত ইকরাম হোসেন (৩০) ঘটনাস্থল থেকে ৯৯৯-এ কল করে। তারপর ওসি আনোয়ারুল আজিম ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি কোরআন শরীফ উদ্ধারের পাশাপাশি ইকরামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে থানায় নিয়ে যান।'
নগরীর বজ্রপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন চিনু রানী দাস। নানুয়ার দীঘির পূর্বৎপাড়ের একটি বাড়িতে তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে তিনি মন্ডপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখতে পান দুই নারী মণ্ডপে কোরআন দেখে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন।
চিনু রানী নিউজ বাংলাকে বলেন, 'এসময় এক ছেলে ছুটে এসে চিৎকার করে বলে, হনুমানের পায়ের কাছে কোরআন, কেউ এখানে থাকবেন না। আর যে কোরআন এখান থেকে সরিয়ে নেবে, তার হাত কেটে ফেলা হবে।'
এই কথা শুনে ভয় পেয়ে যান চিনু। তিনি বলেন, 'আমি একটু সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখছিলাম ছেলেটা কাকে যেন ফোন করে কোরআনের বিষয়টা জানায়। এর কিছুক্ষণ পর সিএনজি দিয়ে একজন লোক আসে এসে কোরান বুকের মধ্যে নেয়।'
সিএনজি অটোরিকশায় আসা ওই ব্যক্তি হলেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনওয়ারুল আজিম। তিনি নিউজ-বাংলাকে বলেন, 'আমি ৯৯৯ থেকে কল পেয়ে একটা সিএনজিতে করে দ্রুত মণ্ডপে আসি।'
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ইকরামও রাতে নেশা করেছিল। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে, ওই রাতে ৩ পিস ইয়াবা সেবন করে, পরে মন্ডপের পাশে অবস্থান নেয়। মণ্ডপে কোরআন রাখে ইকবাল। আর ইকরামের দায়িত্ব ছিল পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানোর। সে অনুযায়ী ৯৯৯-এ সে ফোন করে।
ওসি আনওয়ারুল আজিম মণ্ডপ থেকে কোরআন উদ্ধারের সময় সেটি ফেসবুকে লাইভ করে ফয়েজ নামে এক যুবক। সেই লাইভ এরপরই উত্তেজিত মানুষ জড়ো হন ঘটনাস্থলে। শুরু হয় সহিংসতা। এই ফয়েজকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে নিউজ বাংলাকে বলেন, তাদের ধারণা দিঘীর পাড়ের পূজা মণ্ডপ থেকে যে কোরআন শরিফটি উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি আনা হয় পাশের একটি মাজার থেকে। নানুয়ার দীঘির পাশেই শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি(রা.)-এর মাজারটির অবস্থান। মণ্ডপ থেকে হেঁটে যেতে সময় লাগে দুই থেকে তিন মিনিট। দারোগাবাড়ীর মাজার নামে কুমিল্লাবাসীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত রয়েছে মাজারটির। এর বারান্দা দর্শনার্থীদের তিলাওয়াতের জন্য রাখা থাকে বেশ কয়েকটি কোরআন শরিফ। রাত বা দিন যেকোনও সময় যে কেউ এখানে এসে তিলাওয়াত করতে পারেন।
দারোগাবাড়ীর মাজারের মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করত এমন তিনজনকে ঘটনার পর থেকে দেখা যাচ্ছিল না। তাদের মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একজনের নাম হুমায়ুন কবীর (২৫), অন্য একজনের বিষয়ে নিউজ-বাংলা তথ্য পেলেও তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দারোগাবাড়ীর মাজারের খাদেম আহামুদ্দুন্নাবী মাসুক নিউজ বাংলাকে জানান, 'হুমায়ুন মাজারে এসে নামাজ আদায় করত তার বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার দেওরা এলাকায়। ঘটনার পর দিনই তাকে পুলিশ নিয়ে যায়। মাজারে আরও দুই-একজন নামাজ আদায় করত, তাদের এখন আর দেখা যাচ্ছে না।'
কুমিল্লা জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজ বাংলাকে বলেন, 'মাজারের নিয়মিত যাওয়া ওই তিন যুবকই মণ্ডপে কোরআন রাখার পরিকল্পনায় জড়িত। তাদের মধ্যে দুজন কে আমরা আটক করেছি জিজ্ঞাসাবাদে তারা অনেক তথ্য দিয়েছে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজও ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি। তবে তৃতীয় যুবক ইকবালকে আটক করতে পারলে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। কারন সে সরাসরি মণ্ডপে কোরআন রেখেছিল। তাকে ধরতে আমাদের অভিযান চলছে।'
No comments:
Post a Comment