নিজস্ব সংবাদদাতা, উত্তর দিনাজপুর: দেখতে দেখতে চলে এল পৌষ সংক্রান্তি। এই পৌষ সংক্রান্তি মানেই জিভে জল আনা পিঠেপুলির সমাহার। পিঠেপুলির কথা মানেই নলেন গুড়। যে নলেন গুড় বা খেজুরের গুড় ছাড়া অসম্পূর্ণ এই পিঠেপুলি। সুগন্ধি সেই নলেন গুড় তৈরির কাজে এখন ব্যস্ত উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জের কুনোর আশ্রম পাড়ার শিউলি গৌরচন্দ্র সরকার। পেশায় একজন প্রান্তিক চাষী হলেও সংসারের অভাব পূরনে বাড়তি রোজগারের আশায় শীতের মরসুমে এই নলেন গুড় তৈরির কাজ করেন গৌর বাবু। পৌষপার্বণে বাঙালীর ঘরে ঘরে পিঠেপুলি উৎসবের অন্যতম এই নলেনগুড় তৈরির কাজ কিন্তু সহজ নয়। খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা গাছি অর্থাৎ শিউলির কঠিন পরিশ্রমের ফসল এই সুস্বাদু সুগন্ধি নলেন গুড়।
কনকনে শীতের ভোরে যে সময় সকলে লেপের আড়ালে উষ্ণতার পরশ খোঁজে, সেই সময় প্রচন্ড ঠান্ডাকে উপেক্ষা করে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে আনতে হয় গৌর বাবুর মতো শিউলিদের। সকালের আলো ফোঁটার আগেই সেই মিষ্টি খেজুর রস আগুনে জ্বাল করে তৈরি হয় এই নলেন গুড়। কালিয়াগঞ্জের কুনোর এলাকার নলেন গুড়ের বেশ নামডাক আছে। তার কারন গৌর বাবুর মতো শিউলি, যাদের কঠোর পরিশ্রমের ফসল এই সুস্বাদু নলেন গুড়। গৌর বাবু জানান, এবারে ৩০ টির মতো গাছ নিয়েছেন। একটি গাছ থেকে শীতের এই মরসুমে যে রস সংগ্রহ হয় তা দিয়ে ৫-৬ কিলো নলেনগুড় তৈরি হয়। এই খেজুরগাছের জন্য মালিককে দিতে হয় ২৫০ টাকা।
কুনোর আশ্রমপাড়ার গৌর বাবু জানান, তার বাড়ী থেকে ২ কিমির মধ্যে এই খেজুর গাছগুলো ছড়িয়ে আছে। খেজুর রস সংগ্রহ করতে অগ্রহায়ণ মাসে শীতের শুরুতে এই গাছ কাটতে হয়। এরপর গাছ রস দিতে শুরু করলে হাঁড়ি বেধে সেই রস সংগ্রহের পালা। শীত যত বাড়বে খেজুর গাছের রস তত বাড়বে। প্রতিদিন ভোরে গিয়ে রস ভড়া হাঁড়ি নামিয়ে আনার সময় ফের নতুন হাঁড়ি লাগিয়ে দিয়ে আসতে হয়। কাঁধে হাঁড়ি ঝুলিয়ে শীতের ভোরে পায়ে হেঁটে গাছে গাছে পৌঁছে এই রস সংগ্রহ করে বাড়ী ফিরে আসার সঙ্গেই শুরু হয় নলেন গুড় তৈরির প্রক্রিয়া।
বাড়ীর আঙ্গিনায় মাটির উনুনে বসানো বড় টিনের পাত্রে এই খেজুর রস আগুনে জ্বাল দিতে হয়। রস শুকিয়ে লালচে রঙে পরিনত হলে তা নানা মাপের পাত্রে ঢালা হয়। আগুনে জ্বাল দেওয়া এই খেজুর রস ঠান্ডা হলেই নলেন গুড়ে পরিনত হয়। এই নলেন গুড় দুরকম হয়। পাটালি ও ঝোলাগুড়। চাহিদা ও যোগানের ফাঁরাক থাকার সুযোগে কালিয়াগঞ্জ সহ সারাদেশেই ভেজাল নলেন গুড় থাবা বসিয়েছে। কিন্তু তার মাঝে নিজের কঠোর পরিশ্রমে আসল নলেন গুড় তৈরির কাজ করে চলেছেন কালিয়াগঞ্জের কুনোর এলাকার গৌর বাবুর মতো শিউলি। কালিয়াগঞ্জের বাজারে এই নলেন গুড় প্রতি কেজি ১৫০ টাকায় বিক্রি করছেন গৌর বাবু।

No comments:
Post a Comment