নিজস্ব প্রতিবেদন: সোমবার পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে তেখালি ব্রিজের পাশেই হয়ে গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাই ভোল্টেজ সভা। তার এই সভা ঘিরে আগের দিন অর্থাৎ রবিবার থেকেই প্রস্তুতি ছিল তুঙ্গে। সভাস্থলে তৈরি হয়েছে তিনটি মঞ্চ। একটি মূল মঞ্চ। অন্য দু'টির একটিতে শহিদ পরিবার ও অন্যটিতে তৃণমূল নেতৃত্বের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গোটা রাস্তা সাজানো হয়েছে ঘাসফুলের পতাকা, ব্যানার ও নেত্রীর ছবি দিয়ে। কাজ খতিয়ে দেখতে রবিবার বিকেলে তাই নন্দীগ্রামে পৌঁছে যান সুব্রত বক্সি। সভাস্থল ঘুরে দেখার পাশাপাশি দলের নেতাদের সঙ্গেও আলোচনা করেন তিনি। রাতে আরও কয়েকজন রাজ্যস্তরের নেতারাও নন্দীগ্রামে যান।
এদিন দুপুর ১ টা নাগাদ জনসভা শুরু হয় মমতার। এদিনের সভায় তিনি বাংলা থেকে বিজেপিকে উৎখাত করার শপথ নেন। এদিন বিজেপির উদ্দেশ্যে সুর চড়িয়ে মমতা বলেন, তোমরা প্রধানমন্ত্রী হউ, উপ রাষ্ট্রপতি হউ, রাষ্ট্রপতি হউ, আমার শুভকামনা রইল, কিন্তু কিছুতেই আমি বেঁচে থাকতে বাংলাকে বিক্রি করতে দেব না। বিজেপি যেন অয়াশিং পাউডার, কালো হয়ে সব ঢোকে আর সাদা পরিষ্কার হয়ে বেরিয়ে আসে। ওয়াশিং পাউডার ভাজপা, ওয়াশিং পাউডার ভাজপা।
এদিনের সভা থেকে নন্দীগ্রাম আন্দলনের সময়ে স্মৃতি চারণা করে মমতা বলেন, "এই জায়গাটার নাম তেখালি। মনে আছে এই তেখালিতে কত ঘটনা ঘটেছে। তেখালি ব্রিজের সামনে গুলি চলল। আমার গাড়িতে দু তিনটে বুলেট এসে লাগল। বলল, তোমরা ফিরে যাও। আমরা বললাম, ফিরে যাব না।"
এর পরেই কিছুটা সুর চড়িয়ে তিনি বলেন, ‘একটু মনে করিয়ে দিই। অনেকে বড় বড় কথা বলে। কিন্তু আন্দোলন শুরু হয়েছিল সিঙ্গুর থেকে। আমি তখন রাস্তায় বসে আন্দোলন করছি। তাপসী মালিককে লক্ষ্ণী পুজোর পরের দিন পুড়িয়ে মারা হল। তার পর এখানে আন্দোলন হল ৭ জানুয়ারি। নয়াচরে জমি নেওয়া যাবে না। ১৪ মার্চ গুলি চলল। আমি ২৬ দিন অনশন করেছিলাম। তার ফলে কেন্দ্রের সরকার বলতে বাধ্য হয়েছিল, জোর করে জমি নেওয়া যাবে না।'
তাঁর সংযোজন, ‘আজও বলি, ১৪ মার্চ ২৬ দিন অনশন করার পর শরীর ভেঙে পড়ে। দুটো অপারেশন করতে হয়। নার্সিং থেকে বেরিয়ে শুনি এখানে গুলি চলেছে। সন্ধ্যের সময় যখন কোলাঘাটের কাছে এলাম আমার গাড়ি ঘিরে ধরে হুমকি দিচ্ছে পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে দেবে। গায়ে থুতু দিচ্ছে। বলছে আমাকে জ্বালিয়ে দেবে। তৎকালীন রাজ্যপাল আমাকে ফোন করে বলেন, মমতাজি ফিরে আসুন। আপনাকে মারার প্রস্তুতি চলছে। আমি বললাম, ফেরত যাওয়ার জন্য আসিনি। রাত তখন দুটো বাজে। কোলাঘাট থার্মাল পাওয়ারের গেস্ট হাউজে একটা রুম বুক করা ছিল। দেখি বাস দাঁড় করিয়ে গেট বন্ধ করে রেখেছে। আমরা বাস টপকিয়ে কোলাঘাটের গেস্ট হাউজে পৌঁছাই। পরদিন ফের নন্দীগ্রামে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। কিছুতেই ঢুকতে দেব না। আমি তখন কী করলাম, সেই ছেলেটাকে আজও জেলে আটকে রেখেছে। আনিসুর নাম। বললাম, তোর বাইক নিয়ে আয়। গ্রাম গঞ্জের ভিতর দিয়ে তমলুক হাসপাতাল পর্যন্ত আসতে পারলাম। শেষমেশ নন্দীগ্রামে ঢুকতে পেরেছিলাম। তখন কাউকে দেখতে পারিনি। মনে আছে আবু সুফিয়ান, তাহের, স্বদেশবাবুরা মিলে এই আন্দোলন করেছে। কালীপুজোর দিন আমার বাড়ীতে পুজো হয়, আমি বাড়ী যাইনি, নন্দীগ্রামে গুলি চলছে আমি তৃণমূল ভবনে বসে আছি। আর আবু সুফিয়ানরা আমাকে ফোন করে বলছে, দিদি গুলির শব্দ শুনতে পারছেন, আর আমার বুক ধড়াস ধড়াস করছে।'
এদিনের এই সভায় মমতার সাথে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী, সাংসদ মানস ভুঁইয়া, দোলা সেন, জেলা সভাপতি ডঃ সৌমেন মহাপাত্র, বিধায়ক অখিল গিরি, অর্ধেন্দু মাইতি, সেক সুপিয়ান, আবু তাহের, মামুদ হোসেন, সুপ্রকাশ গিরি, তরুণ জানা, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় কর, অমিয় ভট্টাচার্য, ফিরোজা বিবি, ডাঃ শান্তনু সেন, ইন্দ্রনীল সেন প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের কোর কমিটির সদস্য তথা প্রাক্তন সহকারী সভাধিপতি মামুদ হোসেন জানান, জনসভায় তিন লক্ষাধিক মানুষের সমাগমের প্রত্যাশা ছাড়িয়ে জনসুনামীতে পরিণত হয়েছে সভা। বিশ্বাসঘাতক ও বিভেদকারী শক্তির বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষের জোটের প্রতিফলন আজকের জনসভায় ঘটেছে বলে জানান মামুদ হোসেন। তবে এদিনের মমতার সভায় শিশির অধিকারী ও দিব্যেন্দু অধিকারীর কাউকেই দেখা যায়নি।

No comments:
Post a Comment