ইটাহার থানার মহানন্দপুর গ্রামে এক কোণে দমন মুর্মুর মাটির বাড়ী। বাংলা আবাস যোজনার ঘর নির্মান কাজ চলছে। দু'টি মাটির ঘরের মধ্যে একটি এবারের বর্ষাতেই ভেঙ্গে গেছে। আর সেই দুর্যোগেই ভেঙ্গে গেছে চদর বদর নাচ দেখানোর কাঠের বাক্সটাও। ঝুল, নোংড়া পড়লেও পুতুলগুলো এখনও প্রায় আস্তই আছে। মাটির দাওয়ায় পাটের তৈরী ধোকড়ায় বসে ভাঙ্গা পুতুল গুলো নেড়ে ঘেটে দমন মুর্মু এখনও বিড় বিড় করে সেই চদর বদরের পালাগান আউরে চলেন মাঝে মাঝেই। বেহালার সুতোগুলোতে আগের মতো সুরের মুর্চ্ছনা ছড়িয়ে দিতে না পারলেও সুরে কোথাও ভুল হয় না দমনের। কোমল মায়ের যায়গায় আজও ভুল করে শুদ্ধ মা বাজিয়ে ফেলেন না দমন। কিন্তু যে বেহালার সুরের মুর্চ্ছনা একসময় গাঁয়ের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তো, আজ তা দমনের বাড়ীর সীমানার মধ্যেই ঘোরাফেরা করতে হাঁফিয়ে যায়। তাও আশাবাদী দমন। সরকারী শিল্পীর স্বীকৃতি পাওয়া দমন মুর্মু আজও আশাবাদী, কোনও আদিবাসী যুবক আগ্রহ দেখিয়ে প্রাচীন আদিবাসী সংস্কৃতি চদর বদর পুতুল নাচ তার কাছ থেকে শিখে নেবেন।
বয়স ৭৫ পার করেছে, ১৯ সালে কলকাতা শহরে শেষ অনুষ্ঠান করে এসেছিলেন। একসময় উত্তরবঙ্গ, বিহারের একাংশে দমনের চদর বদরের নাম ডাক ছিল বটে। তবে ১৯ সালের শেষ দিকে একটু বেশীই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তাঁর দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে৷ ছোটো মেয়েই বাবাকে দেখভাল করেন। এখন হাঁটতে একটু বেগ পেতে হয় মুর্মুকে। তবুও চদর বদরের কথা জিজ্ঞাসা করলে একে একে ঘর থেকে ভাঙ্গা স্মৃতি গুলোকে বের করে ফের জোড়ার চেষ্টা করেন দমন। দমন মুর্মু যখন মাটিতে ধোকড়ায় বসে বেহালার সুর ধরার চেষ্টা করেন তখন দমনের ছোট্টো নাতি বিজয় দাদুর পাসে বসে পুতুলগুলো নিয়ে খেলতে থাকে৷ আর নাতনী পুর্নিমা পাশেই একটা ছোট্টো চেয়ারে বসে বোঝার চেষ্টা করে দাদু এসব কি করছেন!
এখন একটা প্রশ্নই দমন মুর্মুর চারিপাশে ঘুরে বেড়ায়, কেউ কি এসে এই প্রাচীন সংস্কৃতি শিখে নেবে? যার উত্তর আজও না পাওয়া গেলেও দমন মুর্মু কিন্তু আজও আশাবাদী।

No comments:
Post a Comment