হিমালয়ের কোলে স্পিতি ভ্যালির চারদিকে মুক্ত বাতাস ও পর্বতের সারি। একই সঙ্গে নিদারুণ শান্ত পরিবেশ। নিশ্চুপ প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝেই বসে আছেন এক বৌদ্ধ ভিক্ষু। পরিবেশের মতোই তিনিও নিশ্চুপ। সেই নিশ্চুপ ভিক্ষুর মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে রহস্য। ৫০০ বছরের বেশি সময় ধরে বসে আছেন এ ভিক্ষু। তবে জীবিত নয়, মমি হয়ে তার এই নিশ্চুপ থাকা।
পাহাড় প্রেমী ভ্রমণকারীদের কাছে ওই মমি একটি রহস্যের নাম। কারণ মমিকে ঘিরে রয়েছে নানা গল্প, যা শোনার পর অবাক লাগে। ভ্রমণকারীরা সংঘ তেনজিংয়ের মমিটির কথা জিজ্ঞেস করতেই সাদা ঘরে নিয়ে যাবে।
কংক্রিটের দেওয়ালে ঘেরা একটি ছোট ঘর। এর মধ্যে রয়েছে কাচের খাঁচায় ঘেরা কালো বস্তু। তবে সেটি বস্তু নয়, সেই আকর্ষণীয় মমি, যার শরীরের জড়ানো রয়েছে সোনালি পাড় দেওয়া সাদা কাপড়। মমিটি বৌদ্ধ ভিক্ষু তেনজিংয়ের মমি নামে বেশ পরিচিত। মমিতে ছোট চেহারা দৃশ্যমান। একটি হাত সামনের দিকে এগিয়ে রয়েছে। মুখটি খোলা, ভেতরে সাদা দাঁত দৃশ্যমান। ওই কাঁচের ভেতরে পাথরের সঙ্গে অনেক টাকাও দেখা যায়।
বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘ তেনজিংয়ের মমি সম্পর্কে জানা যায়, ১৯৭৫ সালে স্পিতি ভ্যালিতে ভূমিকম্প হয়েছিল। পাহাড়ি এলাকা হিসেবে ভূমিকম্পের বিষয়ে তেমন আতঙ্ক নেই স্থানীয় বাসিন্দাদের। তবে ওই সময় টাবু মনাস্ট্রির থেকে ৩০ মাইল দূরে ছোট পাহাড়ি গ্রাম ঘিউয়েনে পাওয়া যায় একটি দেহ, যেটি মমি ছিল। যা সংঘ তেনজিংয়ের মমি হিসেবে দাবি করা হয়। এরপর ২০০৪ সালে পবিত্র মমিটিকে প্রদর্শনের জায়গায় আনা হয়। এখন স্পিতি ভ্যালির সংঘ তেনজিং-এর মমিটি ভারতের একান্ত মালিকানা।
স্থানীয়দের ধারণা, সংঘ তেনজিংয়ের মাহাত্ম্য রয়েছে। মৃত্যু ও মমির হওয়ার ঘটনা দুটোই সংশ্লিষ্ট।
ইতিহাসের তথ্যানুযায়ী, ষোড়শ শতকে হিমালয়ের টাবু মনাস্ট্রির থেকে ৩০ মাইল দূরে বসবাস ছিল সংঘ তেনজিংয়ের। তখন ওই এলাকায় কাঁকড়া ও পোকা মাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যায়। এছাড়া আরও রোগ দেখা দেয়। তাই পুরো এলাকায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়ার শঙ্কায় সবাইকে চলে যেতে বলেন তেনজিং। তবে সেখানে থেকে নিজেকে বলি দিয়ে মমি বানানোর প্রস্তুতি নেন তিনি। ওই সময় তিনি জানান, ঘটনার পর আকাশে একটি রামধনু উঠবে। ধীরে ধীরে সব আগের মতো হয়ে যাবে।
তবে রামধনু উঠার কথা শোনা যায়নি। তবে বাসিন্দারা এলাকায় এসে রোগ ও পোকা মাকড়ের উপদ্রব পাননি। শুধু পড়েছিল তেনজিং-এর মরদেহ।
সংঘ তেনজিং সম্পর্কে আশ্চর্য বিষয় জানা যায় যে, মৃত্যুর আগে তেনজিং ভিক্ষু উপবাস ছিলেন। উপবাসের মাধ্যমে তিনি মৃত্যু বেছে নেন। সবার আগে বার্লি, চাল ও লেগুমস নামের একটি খাবার ছেড়ে দেন। ফ্যাট বাড়ানো খাবার ত্যাগের কারণে তার শরীরের অঙ্গগুলো ধীরে ধীরে ছোট হতে থাকে। সব ফ্যাট ধ্বংস হয়। একই পদ্ধতিতে মমি হওয়ার কথা মিশরীয়দের বেলায় শোনা গেছে। তবে ভারতে জীবিত অবস্থায় একজন মমি হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া রহস্যজনক।
স্পিতি ভ্যালির ওই ঘরে দেখা যায়, সংঘ তেনজিংয়ের মমি বসে রয়েছে। মনে হবে, ধ্যানরত অবস্থায় এই বৌদ্ধ ভিক্ষু মৃত্যুবরণ করেন। স্থানীয়রা তাকে ভগবানের কাছাকাছি হিসেবে দেখেন। কারণ নিজের জীবন বিসর্জন করে গোটা এলাকাকে বাঁচিয়েছিলেন সংঘ তেনজিং।

No comments:
Post a Comment