এখন চলছে করোনাকাল, করোনা পরবর্তীকালে যে কী হতে যাচ্ছে, সেটা জাতিসংঘ সহ বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার আভাস থেকেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু সেটা নিয়ে এখনই চিন্তা করার সময় কই? এখনই তো থেমে গেছে দেশে দেশে অর্থনীতির চাকা। কয়েক সপ্তাহের লক ডাউনে সাধারণ মানুষকে পেটে পাথর বাঁধতে হচ্ছে।
ঘরের ভেতর হয়তো ভাইরাস থেকে নিরাপত্তা পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু ক্ষিদে থেকে? আবার লকডাউন শিথিলের মধ্য দিয়ে বিশ্ব আবারও ভয়াবহ করোনা হামলার মুখে পড়তে যাচ্ছে না, সেটাও বা কেমন করে বলা যায়?
কয়েক সপ্তাহের লকডাউন মিথিল করার পর চীনের পর্যটনস্থলগুলোতে চলতি সপ্তাহে ১০ কোটি মানুষ ছুটে গেছে পাগলের মতো। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কিছু নাপিতের দোকান থেকে শপিং মল পর্যন্ত খুলে দেওয়া হয়েছে। ইতালিতে দুই মাস কঠোরভাবে শারীরিক দূরত্ব পালিত হওয়ার প্রথম বারের মতো পরিবারগুলোর মধ্যে মিলিত হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সাত সপ্তাহ ধরে বিচ্ছিন্ন থাকার পর স্পেনিয়ার্ডরা বাড়ীর বাইরে আসতে শুরু করেছে। জার্মানিতে স্কুল, গির্জা ও জাদুঘর খুলে দেওয়া হয়েছে আর নাইজেরিয়ায় লাগোস ও আবুজা শহরগুলোয় ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। রাস্তাগুলোয় আবার সে আগের মতো ভিড়, যানজট।
আসলে করোনাভাইরাস মহামারী হয়ে হঠাৎ আক্রমণ তাৎক্ষণিকভাবে হতভম্ব করে দিয়েছে বিশ্বকে। ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার পর গত প্রায় এক শতাব্দী ধরে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়নি আর মানুষ।
এরই মধ্যে চাকরিহারা হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সহ বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি মানুষ। অনাহারে দিন কাটানো শুরু হয়ে গেছে তাদের।সরকারগুলো এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় লকডাউন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টায় নানা পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। কিন্তু করোনা প্রতিরোধের ভ্যাকসিন ও চিকিৎসার সঠিক উপকরণ বের করার আগে তাদের এই ধরনের পদক্ষেপকে ‘জুয়া’ খেলা হিসেবে অভিহিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এই খেলায় সামনে আরও বড় বিপদ শুরু হতে পারে বলে তারা সতর্ক করে দিচ্ছেন।
লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিকাল মেডিসিনের সংক্রামক রোগবিষয়ক অধ্যাপক ড. অ্যানেলিজ ওয়াইল্ডার-স্মিথ বলেন, ‘আমরা আসলে বুঝতে পারছি না। এটি একটি বড় ধরনের পরীক্ষা। সরকারগুলোকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব, লকডাউনজনিত স্থবিরতা, সামাজিক বিসংবাদ...এসব বিষয়ে হাজার সীমাবদ্ধতা নিয়েও সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। এছাড়া আর কোন পথ দেখা যাচ্ছে না।’
ওদিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ১ মে প্রকাশিত এক নোটে বলেছেন, কোন দেশই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মোতাবেক লকডাউন পুরোপুরি পালন করতে পারবে না।
অক্সফোর্ডের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, পৃথিবীতে কেবল কয়েকটি দেশ ও অঞ্চলে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার শর্তগুলো ঠিক মতো পালন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এদের মধ্যে তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়া দেশব্যাপী শাটডাউন চাপিয়ে দেয়নি। তবে প্রাথমিক ও দ্রুত পরীক্ষা, শনাক্ত এবং পৃথকীকরণের প্রচারণা চালিয়ে ভাইরাস সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল। চীনও অবশ্য কঠোর লকডাউন চাপিয়েছিল, সেনা মোতায়েন করেছিল এবং গণ নজরদারিরও ব্যবস্থা করেছিল। অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়েও তারা কঠোরতা বজায় রেখেছিল। এখন চীনে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমে গেছে। আক্রান্তের খবর যেগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো চীনে যাওয়া বিদেশিদেরই খবর।
কিন্তু স্পেন, ইতালি ও ফ্রান্স সহ ইউরোপের অনেক দেশ কঠোর লকডাউন শেষে এখন সব কিছুই খুলে দিতে যাচ্ছে, অথচ এখনও প্রতিদিনই দেশগুলোতে হাজার হাজার আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ড. ওয়াইল্ডার-স্মিথস বলেন, ইউরোপের সরকার ও জনগণ মেনে নিয়েছে, তাদের এর মধ্য দিয়েই এগোতে হবে। এই ভাইরাসের সঙ্গে বাস করতে হবে। অর্থনৈতিক মন্দা, সংক্রমণ ও মৃত্যুর সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করতে হবে। তিনি বলেন, এর কোন ঠিক কিংবা ভুল নেই। সবাইকে চলতে হবে নিজ নিজ প্রয়োজনের তাগিদে| সক্ষমতা থাকলে ভার, না থাকলে কিছু করার নেই।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে, বিশ্বের সবচেয়ে অহঙ্কারী প্রেসিডেন্টের শাসনাধীন দেশটিতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের নিশ্চিত খবর রয়েছে এবং এ পর্যন্ত মারা গেছে পৌণে একলাখের মতো মানুষ, তারা কিন্তু ভিন্ন পথ ধরেছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে প্রবল চাপে পড়া ট্রাম্প প্রশাসন দেশের প্রায় অর্ধশতাধিক রাজ্য ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ সত্ত্বেও বিধিনিষেধ প্রত্যাহার শুরু করেছে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারী বিষয়ক অধ্যাপক ওয়াফা এল-স্যাডর বলেন, মহামারী কোনও সীমানা মানে না। কিন্তু বিশ্বকে এখন জুয়া খেলায় নামতে হবে। জীবন নিয়ে জুয়া।

No comments:
Post a Comment