বলিউডের বরেণ্য অভিনেতা ইরফান খানের মৃত্যু হলো সপ্তাহ দুয়েক। তাঁর অকালপ্রয়াণে শুধু বিশ্ব চলচ্চিত্র দুনিয়ায় নয়, সালমা হায়েক, নাটালি পোর্টম্যান, টম হ্যাঙ্কস, ক্রিস প্যাটদের সঙ্গে দেশের আটপৌরে এক ডজন গ্রামেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বায়োস্কোপের রঙিন দুনিয়ার ঝলকানি এই গ্রামে এখনও পৌঁছায়নি। তবে মহারাষ্ট্রের এই গ্রামগুলোর প্রত্যেক মানুষের অন্তরে বেঁচে আছেন ইরফান খান।
মহারাষ্ট্রের ইগতপুরীর কাছে এক ডজন গ্রাম আছে। এই গ্রামগুলোর মানুষের কাছে ইরফান যেন সৃষ্টিকর্তার পাঠানো দেবদূত। তাই তাঁর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ গ্রামবাসী ইরফানকে শ্রদ্ধা জানাতে ১২টি গ্রাম নিয়ে এলাকার নাম ‘হিরো-চি-ওয়াড়ি’ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার বাংলায় তরজমা করলে দাঁড়ায় হিরোর বাড়ি।
এই গ্রামগুলোর কোথাও কোন সিনেমা হল নেই। গ্রামবাসীদের কাছে এই জগতের একটাই পরিচিত নাম ‘ইরফান’। তাই তাঁদের প্রিয় এই মানুষটির সিনেমা দেখতে ৩০ কিলোমিটার দূরে নাসিক শহরে হাজির হন গ্রামবাসী। ইরফানের কোন ছবি মুক্তি পেলে তাঁদের দেখা চাই-ই চাই। আর ছোট পর্দায় ইরফান এলে সদলবলে সবাই বসে পড়েন টেলিভিশনের সামনে।
মহারাষ্ট্রের এই হতদরিদ্র গ্রামবাসীর কাছে আসল হিরো। ইগতপুরীর এই পিছিয়ে পড়া গ্রামগুলোর উন্নয়নের কাজে এগিয়ে এসেছিলেন ইরফান। এসব গ্রামে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিয়েছেন বলিউডের এই প্রভাবশালী অভিনেতা। গ্রামগুলোর শিশুদের জন্য তিনি নির্মাণ করে করেছেন বিদ্যালয়। অ্যাম্বুলেন্সেরও ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এক দশক আগে ইরফান ইগতপুরীতে জায়গা কিনে ফার্ম হাউস বানিয়েছিলেন।
গত ২৮ এপ্রিল কোলনের সংক্রমণ নিয়ে কোকিলাবেন হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হয়েছিলেন। এরপরই শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে এবং একসময় সব চিকিৎসার ঊর্ধ্বে চলে যান তিনি। তাঁকে আর ফেরানো যায়নি। হাসপাতালে তাঁর পাশেই ছিলেন ইরফানের স্ত্রী সুতপা সিকদার এবং তাঁদের দুই ছেলে।
১৯৬৭ সালের ৭ জানুয়ারি রাজস্থানের জয়পুরে জন্ম ইরফানের। এমএ পড়ার সময়েই ১৯৮৪ সালে পেয়ে যান ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় পড়ার জন্য স্কলারশিপ। ১৯৮৭ তে পড়াশোনা শেষ করে ইরফান মুম্বাই পাড়ি দেন। এরপর থেকে মঞ্চ এবং রুপালি পর্দা হয়ে ওঠে জীবনের ধ্যানজ্ঞান। শুরুতে ‘চাণক্য’, ‘সারা জাহা হামারা’, ‘বনেগি আপনি বাত’ ও ‘চন্দ্রকান্তা’র মতো টেলিভিশন সিরিয়ালে অভিনয় করেন। ১৯৮৮ সালের আগে মূলত টেলিভিশন সিরিয়াল ও থিয়েটারেই অভিনয় করেছেন ইরফান। ১৯৮৮ সালে ‘সালাম বোম্বে’ সিনেমায় অতিথি শিল্পীর ভূমিকায় অভিনয়ের প্রস্তাব তাঁকে দিয়েছিলেন মীরা নায়ার। ১৯৯০ তে ‘এক ডক্টর কি মৌত’ সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। এরপর তাঁর অন্য কয়েকটি সিনেমায় সেভাবে নজর কাড়েনি। বেশ কিছু অসফল সিনেমার পর পটপরিবর্তন আসে লন্ডনের পরিচালক আসিফ কাপাডিয়ার হাত ধরে। কাপাডিয়া ইতিহাসভিত্তিক সিনেমা ‘দ্য ওয়ারিয়র’-এ তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র দেন। ২০০১ সালে ‘দ্য ওয়ারিয়র’ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে প্রশংসিত হয়। আর এই সিনেমার হাত ধরে চলচ্চিত্র মহলে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন ইরফান। ২০০৩ সালে শেকসপিয়ারের ‘ম্যাকবেথ’ অবলম্বনে ‘মকবুল’ সিনেমায় নামভূমিকায় অভিনয় করেন ইরফান।
২০০৫ সালে ‘রোগ’ সিনেমায় বলিউডে তাঁকে প্রথমবার মুখ্য চরিত্রে দেখা যায়। এরপর বলিউডের একের পর এক সিনেমায় হয় তাঁকে প্রধান বা পার্শ্ব চরিত্র বা ভিলেনের ভূমিকায় দেখা গেছে। ২০০৭ সালে বক্স অফিসে হিট ‘মেট্রো’ সিনেমার জন্য ফিল্মফেয়ার সেরা পার্শ্ব চরিত্রের পুরস্কার পেয়েছিলেন ইরফান। তাঁকে ‘আ মাইটি হার্ট’ ও ‘দ্য দার্জিলিং লিমিটেড’-এর মতো আন্তর্জাতিক সিনেমাতেও দেখা গেছে।
শুধু বলিউডই নয়, হলিউডেও নিজের প্রতিভা দেখিয়েছেন ইরফান। কাজ করেছেন একাধিক নামী পরিচালকের সঙ্গে। ‘স্লামডগ মিলেনিয়ার’, ‘লাইফ অব পাই’, ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’, ‘দ্য আমেজিং স্পাইডারম্যান’–এর মতো হলিউড ছবিতে অভিনয় করেছেন ইরফান খান। অভিনয় করেছিলেন বাংলাদেশের পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ডুব’ ছবিতে।

No comments:
Post a Comment