এলিসা জার্মানির লুডভিড-ম্যাক্সিমিলিয়ানস বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক। দুই বছর তিনি জুরিখের অণুজীব বিজ্ঞানী মার্টিন অ্যাকারম্যানের সঙ্গে রোগ প্রতিরোধবিদ্যা (ইমিউনোলজি) বিষয়ে গবেষণা করেন। পরে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইফসায়েন্স গ্র্যাজুয়েট স্কুলে গবেষণাকাজে নিয়োজিত থেকেছেন আরও তিন বছর। ওই সময়কালের মধ্যে তিনি জার্মানির জাতীয় মেধা ফাউন্ডেশন বৃত্তি, আমেরিকার পোস্ট ডক্টরাল বৃত্তি ও জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা তহবিল বৃত্তি লাভ করেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি প্রাণিবিদ্যা বিভাগে পোস্ট ডক্টরাল গবেষক হিসেবে অধ্যাপক কেভিন ফস্টারের সঙ্গে কাজ করেছেন। তিনি ২০১৮ সালে অক্সফোর্ডের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে ব্যাকটেরিয়াল ওয়ার্ল্ড প্রদর্শনীতে অংশ নেন। ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে তাঁর পাঁচটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। একটির নাম মোটামুটি এমন—ব্যাকটেরিয়া যুদ্ধে কোষের গণ-আত্মদানের বিবর্তন (দ্য ইভল্যুশন অব মাস সেল সুইসাইড ইন ব্যাকটেরিয়াল ওয়ারফেয়ার)। আরেকটির নাম ব্যাকটেরিয়া যুদ্ধের বিবর্তন ও বাস্তুসংস্থান (দ্য ইভল্যুশন অ্যান্ড ইকলজি অব ব্যাকটেরিয়াল ওয়ারফেয়ার)।
এবার ভ্যাকসিন নিয়ে
অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটি (টিকা) নিয়ে কাজ শুরু করে গেল ১০ জানুয়ারি। ভ্যাকসিনটি শিম্পাঞ্জি থেকে পাওয়া একটি সাধারণ ঠাণ্ডা-সর্দি ভাইরাসের (অ্যাডেনোভাইরাস) দুর্বল সংস্করণ থেকে তৈরি করা হয়েছে। এর নাম রাখা হয়েছে ChAdOx1 nCoV-19। (ভ্যাকসিনটি পরীক্ষার জন্য) গবেষকরা মার্চ মাসে ইংল্যান্ডের টেমস ভ্যালি অঞ্চলে স্বেচ্ছাসেবক খোঁজা শুরু করে। প্রাথমিকভাবে ৩২০ জনকে নির্বাচিত করা হয়। সবার প্রথমেই টিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয় ড. এলিসা গ্রানাটোকে। ভ্যাকসিনটি এলিসার শরীরে স্পাইক প্রোটিন প্রতিরোধী প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে। ফলে কোভিড-১৯ ভাইরাস তার কোষে প্রবেশ করতে পারবে না। আগামী কয়েক মাসজুড়ে এলিসার শরীর একটি গবেষণাগার হয়ে উঠবে। তিনি মাঝেমধ্যে মাথাব্যথা ও জ্বরে ভুগতে পারেন। এ টিকা দেহে একধরনের নকল সংক্রমণের সৃষ্টি করছে। কিন্তু শেষে এলিসার শরীরের প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে মিলে করোনা প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি করছে। এটাকে বলা হয় নিউট্রালাইজিং বা বাইন্ডিং অ্যান্টিবডি। নিজে ভাইরাসটিকে সরাসরি ধ্বংস করবে না। প্রথমে পাকড়াও করবে, তারপর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় নিয়োজিত কোষগুলোকে খবর পাঠাবে। তারা ভাইরাসটিকে ধ্বংস করবে। ব্যাপারটা অনেকটা জনগণ আসামিকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার মতো। এই অ্যান্টিবডি এলিসার শরীরে কয়েক বছর পর্যন্ত সক্রিয় থাকবে এবং ভাইরাসটির পুনরায় আক্রমণ প্রতিরোধেও কার্যকর থাকবে। ভ্যাকসিন গ্রহণের পর থেকে এলিসা তাঁর শারীরিক ও মানসিক যেকোন পরিবর্তনের বিষয় একটি ই-ডায়েরিতে লিখে রাখছেন। একাধিক ডাক্তারি পরীক্ষার মধ্য দিয়েও যেতে হচ্ছে তাঁকে। উল্লেখ্য, গবেষকরা প্রায় ৫০০০ স্বেচ্ছাসেবীকে এই ভ্যাকসিন পরীক্ষার আওতায় নিয়ে আসছেন। তাঁরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে স্বাস্থ্যকর্মীদেরই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। অক্সফোর্ডের গবেষকদলটি এর আগে মার্স সংক্রমণের (করোনা ভাইরাসের একটি সংস্করণ) টিকা তৈরিতে সাফল্য পেয়েছিলেন।
এলিসা চেয়েছিলেন
সব জীবন বাঁচানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন এলিসা। বিজ্ঞান তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। শরীরটাকেও দিয়েছেন বিজ্ঞানকে। জীবন বাঁচানোর উৎসবে যোগ দিয়ে নিজেকে ধন্য মনে করছেন। অক্সফোর্ড ল্যাবে অনেক বড় বড় আবিষ্কার হয়। আবার অনেক দুর্ঘটনার নজিরও আছে। তাঁর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হলে বেঁচে যেতে পারে কোটি প্রাণ কিন্তু যদি অ্যান্টিবডি ডিপেন্ডেন্ট এনহান্সমেন্ট ঘটে, তবে এলিসা পড়তে পারেন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে। এর মধ্যে খবরও ছড়িয়েছিল, টিকা গ্রহণের পর এলিসা মারা গেছেন। কিন্তু খবর ছড়ানোর পরপরই ট্যুইটারে নিজের অ্যাকাউন্টে এলিসা লিখেছেন, আমি ১০০% জীবিত।

No comments:
Post a Comment