বিশেষ প্রতিবেদন: বিতর্ক আর বিতর্ক। সব জায়গায়, সব ক্ষেত্রে কোনও না কোনও ইস্যুকে কেন্দ্র করে ছড়াচ্ছে বিতর্ক। সেই খাতায় নাম উঠে এল রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বসন্ত উৎসবের। গত ৫ মার্চ বসন্ত উৎসব পালনের দিন মেয়েদের খোলা পিঠে বিশ্বকবি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা গানের লাইন বিকৃত করে, তাতে অশ্লীল শব্দ যোগ করে লেখা হয়েছে রঙ দিয়ে। পাশাপাশি ছেলেদের বুকেও অশ্লীল লেখা। আর ছবি নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হতেই রীতিমত শোরগোল উঠেছে চারিদিকে।
জানা গিয়েছে, এই ঘটনার জেরে ইতিমধ্যেই পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন উপাচার্য শ্রী সব্যসাচী বসু চৌধুরী মহাশয়। তিনি নৈতিক ভাবে এই ঘটনার দায় স্বীকার করে নিয়েছেন। আর এই ঘটনার কারণে এখানকার ঐতিহ্যবাহী বসন্ত উৎসব আর কখনও পালন করা হবে কি না, সে নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
তবে সংবাদ মাধ্যম সূত্রে খবর, অভিযুক্তরা কেউই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া নয় এবং তারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছেন।
তবে বিশ্বকবি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের লাইন এভাবে বিকৃত কুরুচিকর করে তোলার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পরতেই ওঠে সমালোচনার ঝড়। দাবি ওঠে দোষীদের শাস্তির।
এই নিয়ে যখন নেট পাড়া থেকে গোটা রাজ্য সর্বত্র তোলপাড় হচ্ছে, ঠিক সেই সময় মালদার স্বনামধন্য সরকারি এক গার্লস হাইস্কুলের চার জন ছাত্রী আরও চার কদম এগিয়ে গিয়ে রবীন্দ্র সঙ্গীতের সুরে চরম অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করে তৈরি করে ফেলে একটি ভিডিও। এই নিয়ে আবারও শুরু হয়েছে সমালোচনার ঝড়। স্কুল কর্তৃপক্ষের নাকের ডগা দিয়ে কীভাবে তারা একাজ করল, প্রশ্ন উঠছে। এর মধ্যে তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তির দাবিও উঠেছে (সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে)।
এই সব কিছুর মধ্যে আবার এমন কথাও উঠে এসেছে, প্রতিহিংসাপরায়ণ না হয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষমা করে সঠিক শিক্ষা দেওয়াই সমাজের কর্তব্য।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে কবিগুরু আমাদের গর্ব, বিশ্বের দরবারে যাঁর গান আমাদের মাথা উঁচু করে দেয়, যে গান আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দেয়, সেই কবিগুরুর গান আক্রান্ত হচ্ছে, আক্রান্ত হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি। তাও আবার আমাদের বাংলায় এবং শিক্ষার্থীদের হাত ধরে। এরপর তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম রয়েইছে। সেখানেও ট্রোল করা হচ্ছে এসব নোংরা কুরুচিকর সব শব্দ ব্যবহার করে। তাহলে এর জন্য উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে না কেন? এই লজ্জা আমাদের জাতির লজ্জা, দেশের লজ্জা। আধুনিকিকরণের অর্থ এই তো নয়, যে নিজেদের সংস্কৃতি বিসর্জন দিয়ে বা তাকে হাস্যরসের মাধ্যম করে সকলের সামনে উপস্থাপন করা। যদি নিজের সংস্কৃতির সম্মান আমরা নিজেরাই না করতে পারি, তাহলে কিসের আধুনিকতা! আর এইসব কাণ্ড যে বা যারা ঘটিয়ে থাকেন, তাদের অবশ্যই উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিৎ। শুরুটা তো সেদিনই হওয়া উচিৎ ছিল, যেদিন ইউটিউবার রোদ্দুর রবীন্দ্র সঙ্গীতের অবমাননা করে সেই বিকৃত কুরুচিকর গানটি বানিয়েছিলেন। হয়তো তারই আংশিক প্রভাব পড়েছে এই শিক্ষার্থীদের ওপর। তাই দোষীদের তো অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিৎ। নাহলে এই সামাজিক ব্যধি, মহামারির আকার নিতে খুব একটা সময় নেবে না। আর আশা করছি উল্লেখিত দুটি ঘটনা এর প্রমাণ দিচ্ছে। অতএব আগাছার জন্ম হলে, সেটা শুরুতেই নির্মূল করা প্রয়োজন।
তাই ছাত্র সমাজের কাছে অনুরোধ, তোমরা দেশের ভবিষ্যৎ, দেশ ও জাতির উন্নয়ন তোমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির হাত ধরে তাকে সঙ্গে করে এগিয়ে নিয়ে যেতে যদি নাই পারো, তাহলে কিসের আধুনিক, কিসের আধুনিকতা!
আর এ ব্যাপারে অভিভাবকদেরও কিছুটা সতর্ক হওয়া প্রয়োজন আছে বই কি! সন্তানের আচরণের ওপর কিছুটা লক্ষ্য রাখুন। তারা কি করছে, কেমন ধরনের চর্চা করছে, মোবাইলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের সক্রিয়তা কতটা, কীভাবে তারা সেটা ব্যবহার করছে, লক্ষ্য রাখাটা অবশ্যই প্রয়োজন। যদিও আজকালকার সন্তানরা একটু বেশি এগিয়ে, তা হলেও, এসব কিছু নজর রাখতেই হবে। প্রয়োজনে কখনও শক্ত, তো কখনও নরম হতে হবে।
শেষ কথাগুলো তাদের উদ্দেশ্যে, যারা অনবরত সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব ব্যাপার নিয়ে ট্রোল হতে দেখেও সেখানে হাসির প্রতিক্রিয়া জানান, তারপর সেটা শেয়ার, লাইক তো চলতেই থাকে। এসব না হয় বন্ধ হোক এবার। যদি আমরা প্রতিবাদ নাই করতে পারি, তাহলে এই হাসাহাসি থেকেও যেন বিরত থাকি।
আসুন না সকলে মিলে একটু চেষ্টা করে দেখি, যাতে অন্তত আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্য যেন এভাবে আক্রান্ত না হয়। আমাদের গর্বের জায়গাটা যেন এভাবে ভূ লুন্ঠিত না হয়।

No comments:
Post a Comment