যে কোন ফ্লু বা ভাইরাস থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা হাত ধোওয়ার পরামর্শ দেন। আবার যে কোনও কিছু খাবার আগে পরে, ময়লা কিছু ধরলে হাত পরিষ্কার করতে হাত ধোওয়ার বিকল্প আর কিছুই নেই।
মোট কথা, জীবাণু প্রতিরোধে অন্যতম সেরা উপায় হলো হাত ধোওয়া।
তবে জানেন কি, এই হাত ধোওয়ার প্রচলন কোথা থেকে এল, আর কে-ই বা এটি আবিষ্কার করল?
হাত ধোওয়ার প্রারম্ভিক প্রবক্তা ছিলেন ইঙ্গনাজ সেমেলওয়েস। তিনি ছিলেন একজন হাঙ্গেরিয়ান ডাক্তার। উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের কিছু ডাক্তার শুধু মাত্র রোগীদের পরীক্ষা করার আগে তাদের হাত ধুতেন। তবে সেমেলওয়েস ১৮৪৪ থেকে ১৮৮৪ সাল পর্যন্ত ভিয়েনা জেনারেল হাসপাতালে কাজ করেছিলেন। সেসময় তিনি নারী ওয়ার্ডে কাজ করতেন। সেখানে তিনি দেখতে পান মাতৃ মৃত্যুর হার ওয়ার্ড প্রতি ৩৬ দশমিক ২১০০ জন। আর সেখানে কাজ করা ডাক্তারদের মৃত্যুর হাড় ৯৮ দশমিক ৪১০০ জন।
এ তথ্যটি ২০১৩ সালে মেডিসিন রয়েল সোসাইটির জার্নালে প্রকাশ করা হয়। এছাড়াও এখানকার ডাক্তাররা প্রায়ই চাইল্ডবেড ফিভারে ভুগতেন, যা এখন স্ট্রেপ্টোকোকাল সংক্রমণ হিসাবে পরিচিত।
সেমেলওয়েস এ ব্যাপারগুলো লক্ষ্য করেন এবং এর কারণ খুঁজতে শুরু করেন। হাসপাতালে কোনও নারী মারা গেলে সেখানকার একজন পুরোহিত তাদের সৎকার করতেন এবং ঘণ্টা বাজাতেন। সেমেলওয়েস ভাবতে থাকেন ঘন্টার শব্দে নারীরা মারা যাচ্ছেন। তবে এটা কীভাবে সম্ভব? ১৮৪৭ সালে সেমেলওয়েসের সহকর্মী জাকোব কোললেটেসকার মৃত্যু হলে তিনি আবার এ ব্যাপারে তৎপর হন।
কোললেটেসকার ময়নাদতন্তের সময় এক ডাক্তারের আঙ্গুল কেটে যায়। এরপর সেই ডাক্তার এক প্রসূতির চিকিৎসা করেন। এর কয়েকদিন পর সেই চিকিৎসক এবং রোগী দুজনই মারা যান। এরপরই সেমেলওয়েসের এর কারণ ধরতে পারেন। মৃত দুজনের শরীরেই পাওয়া যায় একই ভাইরাস, যে ভাইরাসে মৃত্যু হয়েছিল কোললেটেসকার। আঙ্গুল কেটে যাওয়ার ফলে কাটা জায়গা দিয়ে ময়নাতদন্ত করা ডাক্তারের শরীরে ওই ভাইরাস প্রবেশ করে। এরপর প্রসূতি নারী রোগীর শরীরে প্রবেশ করে এ ভাইরাস। এভাবেই আক্রান্ত হন তারা দুজন।
এরপরই সেমেলওয়েস পরামর্শ দেন ময়নাতদন্তের পর ডাক্তাররা ক্লোরিনযুক্ত চুন দিয়ে তাদের হাত ধোবেন। এরপরই নারী মৃত্যু হার প্রায় একস্তর কমে যায়। এছাড়াও স্ট্রেপ্টোকোকাল বা চাইল্ডবেড ফিভারের সংক্রমনও কমতে থাকে। যদিও এটি অনেক পুরনো সংক্রমন ছিল। তবে পুরোপুরিভাবে কোনটাই ঠেকানো সম্ভব হচ্ছিল না।
সেমেলওয়েস বসে নেই। তিনি তার গবেষণা চালিয়েই যাচ্ছেন। যে কোনো রোগীর চিকিৎসা করার আগে হাত ধোওয়ার পরামর্শ দিতে থাকেন তিনি। হাত ধোওয়ার ফলে বিভিন্ন সংক্রমের মাত্রা কমে যায়। ফলে মৃত্যুর হার কমতে থাকে। সেমেলওয়েস উনিশ শতকের একমাত্র চিকিৎসক যিনি রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর দিকগুলোর ব্যাপারে সচেতন করতে পেরেছিলেন।
এরপর ১৮৪৩ সালে আমেরিকান ডাক্তার অলিভার ওয়েনডেল হোমস দাবি করেন যে, ডাক্তারদের নোংরা হাতের ফলে রোগীরা চাইল্ডবেড ফিভারে আক্রান্ত হয়। তাই রোগীর চিকিৎসার আগে ও পরে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে পরামর্শ দেন তিনি। আধুনিক নার্সিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল ১৮৮০ এর প্রকাশনা নোটস অন নার্সিংয়ে লিখেছিলেন যে, প্রতিটি নার্সকে দিনের বেলা খুব ঘন ঘন হাত ধোওয়ার ব্যাপারে যত্নবান হওয়া উচিৎ।
তবে বিজ্ঞানীরা জীবাণু প্রতিরোধ না করা পর্যন্ত চিকিৎসকদের হাত ধোওয়ার গুরুত্ব বুঝতে পারেননি। কিছু রোগ এবং সংক্রমণ রয়েছে, যা অণুজীবগুলোর দ্বারা ঘটে। এগুলো খালি চোখে দেখা যায় না। ব্রিটিশ সার্জন জোসেফ লিস্টার হাত ধুয়ে এবং রোগীদের চিকিৎসা করার পক্ষে সমর্থন দিয়ে ছিলেন। এতে করে রোগীদের মৃত্যুহার আশ্চর্যজনকভাবে উন্নতি করেছিল।
আজ চিকিত্সা এবং স্বাস্থ্য পেশাদাররা নিজের এবং তাদের রোগীদের উভয়ই হাত ধোওয়ার ব্যাপারে খুবই সচেতন। এছাড়াও যে কোন জীবাণু প্রতিরোধে অন্যতম সেরা উপায় হাত ধোওয়া।
যে কোন জীবাণু প্রতিরোধে অন্যতম সেরা উপায় হাত ধোয়া
রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র বা সিডিসি হাতকে কীভাবে সঠিকভাবে ধুতে হয় তার জন্য নির্দেশিকা দেয়। এভাবে হাত ধুলে জীবাণুগুলোকে সঠিকভাবে প্রতিরোধ করা যায়। সিডিসির পরামর্শ মতে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে হাত স্ক্রাব করে নিতে হবে। এরপর পরিষ্কার জল দিয়ে সাবান ধুয়ে নিন। এরপর পরিষ্কার কাপড় দিয়ে হাত মুছে নিন অথবা বাতাসে হাত শুকিয়ে নিন।

No comments:
Post a Comment