স্বাধীনতা দিবস আমরা যতটা আনন্দের সাথে পালন করি, তার থেকেও শতগুণ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের কাহিনী জড়িয়ে আছে এই স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে। এরকমই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সাথে জড়িয়ে আছেন ভগৎ সিং, সুখদেব এবং রাজগুরু, যারা দেশের স্বাধীনতা অর্জনে নিজেদের প্রান বিসর্জন দিয়ে শহীদ হয়েছিলেন। আজ ২৩ শে মার্চ তাঁদের ফাঁসি হয়েছিল, তাঁদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে আমাদের আজকের এই প্রতিবেদন।
অবিভক্ত ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করার অন্যতম প্রভাবশালী বিপ্লবী ছিলেন শহীদ ভগৎ সিং। ভগৎ সিং ১৯০৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পাঞ্জাবের লায়ালপুর জেলার বাঙ্গার নিকটস্থ খাতকর কালান গ্রামের এক সান্ধু জাট পরিবারে জন্মগ্রহন করেন।
ভগৎ সিং-এর পরিবার পূর্ব থেকেই ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিল। কৈশোরেই ভগৎ ইউরোপীয় বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে পড়াশোনা করেন এবং নৈরাজ্যবাদ ও কমিউনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হন। এরপর তিনি একাধিক বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের (এইচআরএ) সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি অচিরেই এই সংগঠনে নেতায় পরিণত হন এবং সংগঠনটিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনে এটিকে হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনে (এইচএসআরএ) রূপান্তরিত করেন। জেলে ভারতীয় ও ব্রিটিশ বন্দীদের সমানাধিকারের দাবিতে ৬৪ দিন টানা অনশন চালিয়ে তিনি সমর্থন আদায় করেন।
ভগৎ সিং-এর এর পিতার নাম সর্দার কিসান সিং সান্ধু ও মায়ের নাম বিদ্যাবতী। তিনি যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সেটি ছিল এক দেশপ্রেমিক শিখ পরিবার। এই পরিবারের কোনও কোনও সদস্য দেশের বিভিন্ন স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অতীতে এই পরিবারের কোনও কোনও সদস্য আবার মহারাজা রঞ্জিত সিংহের সেনাবাহিনীতে কাজ করতেন। ভগতের ঠাকুরদাদা অর্জুন সিং, দয়ানন্দ সরস্বতীর হিন্দু সমাজ সংস্কার আন্দোলন আর্যসমাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভগতের উপরেও এই সংগঠনের গভীর প্রভাব পরিলক্ষিত হত। ভগতের বাবা ও দুই কাকা অজিত সিং ও স্বরণ সিং কর্তার সিং সরভ গ্রেওয়াল ও হরদয়াল নেতৃত্বাধীন গদর পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অজিত সিং-এর নামে একটি মামলা দায়ের করা হলে তিনি পারস্যে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। অন্যদিকে ১৯২৫ সালের কাকোরি ট্রেন ডাকাতির ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় ১৯২৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর স্বরণ সিং-এর ফাঁসি হয়।
ভগতের যখন স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়েছিল, সে সময় তার বয়সী ছেলেরা সাধারণত লাহোরের খালসা হাইস্কুলে পড়াশোনা করতেন। কিন্তু ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের প্রতি এই স্কুলের আনুগত্যের কারণে তাঁর ঠাকুরদাদা তাঁকে এখানে পাঠাননি। পরিবর্তে ভগতের বাবা তাঁকে আর্যসমাজি বিদ্যালয় দয়ানন্দ অ্যাংলো-বৈদিক স্কুলে ভর্তি করেন। এই স্কুলে পড়াশুনার সময় হঠাৎ একদিন দুপুর বেলা ভগৎ সিংকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। স্কুলের সবাই বাড়ী ফিরেছে, কিন্তু ভগৎ সিংকে কোথাও পাওয়া গেল না। তিনি তখন ক্লাস সেভেনে পড়েন। বয়স মাত্র ১২ বছর। সবাই তাঁকে খুঁজতে বের হল। ওদিকে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে, আতঙ্কে সবাই ছোটাছুটি করছেন। স্কুলে খবর নিয়ে জানা গেল ভগৎ সিং যথারীতি ক্লাস করেছেন; তারপর কোথায় গেছেন কেউ জানেন না। অনেক রাতে তাঁর দেখা মিলল। হাতে জালিয়ানওয়ালাবাগের শত শহীদের রক্ত মাখা মাটি।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে ভগৎ মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। এই সময় তিনি প্রকাশ্যে ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরোধিতা করেন এবং তাঁর সরকারি স্কুলবই ও বিলিতি স্কুল ইউনিফর্ম পুড়িয়ে ফেলেন। ১৯২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী হঠাৎ উত্তরপ্রদেশের গোরখপুর জেলার চৌরীচেরা গ্রামে কৃষকদের শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন সমাপ্ত করে দেওয়ার জন্য পুলিশ জনতার উপর গুলি চালায়। এতে কয়েকজন কৃষক মারা যায়। ফলে বিক্ষুব্ধ জনতা থানা ঘেরাও করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। থানার ভিতর ২২ জন পুলিশ পুড়ে মারা যায়। এতদিন ধরে ব্রিটিশ প্রশাসন ভারতের স্বাধীনতাকামী জনগণের উপর যে অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে সে তুলনায় এটি কিছুই নয়। এটি ছিল একটি বিক্ষিপ্ত দুঃখজনক ঘটনা। তবু গান্ধীজী এই ঘটনার কারণে অসহযোগ আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ান। এতে হতাশ হয়ে ভগৎ যুব বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দেন এবং সশস্ত্র বিপ্লবের পন্থায় ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করার কথা প্রচার করতে থাকেন।
১৯২৩ সালে ভগৎ সিং পাঞ্জাব হিন্দি সাহিত্য সম্মেলন কর্তৃক আয়োজিত প্রবন্ধ রচনা প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করেছিলেন। এটি পাঞ্জাব হিন্দি সাহিত্য সম্মেলনের সাধারন সম্পাদক সহ অন্যান্য সদস্যদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি পাঞ্জাব লেখক দ্বারা রচিত অনেক কবিতা এবং সাহিত্য পাঠ করেন এবং তার পছন্দের কবি ছিলেন আল্লামা ইকবাল।
ভগৎ সিং কিশোর বয়সে লাহরের ন্যাশনাল কলেজে পড়াশুনা আরম্ভ করেন কিন্তু বাল্য বিবাহ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বাড়ী থেকে পালিয়ে যান এবং ‘নওজাওয়ান ভারাত সাভা’ (ভারত যুব সভা) এর সদস্য হন। এই সংস্থায় ভগৎ সিং এবং তার আর বিপ্লবী সহকর্মীরা যুবকদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ইতিহাস শিক্ষক, প্রফেসর বিদ্যালংকরের সাথে পরিচিত হওয়ার মাধ্যমে ভগৎ হিন্দুস্তান রিপাবলিক এসোশিয়াশন এর সাথে যুক্ত হন যেখানে রাম প্রসাদ বিসমিল, চন্দ্র শেখর আজাদ এবং আসফাক উল্লাহ খানের মত বিশিষ্ট নেতারা ছিলেন।
১৯২৮ সালের ৩০ অক্টোবর লাহোরে লালা লাজপত রায়ের নেতৃত্বে একটি নীরব অহিংস পথযাত্রার উপর পুলিশ লাঠি চার্জ করে। এসময় লালা লাজপত রায় পুলিশের নৃশংস লাঠি চার্জের শিকার হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে মারা যান। ভগৎ সিং এই পথযাত্রায় ছিলেন। তিনি এই ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন। বিপ্লবী ভগৎ সিং, রাজগুরু, সুখদেব ও জয় গোপাল একত্রে মিলিত হয়ে ওই ঘটনার নেতৃত্বদানকারী পুলিশ প্রধান স্কটকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। জয় গোপালকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, স্কটকে সনাক্ত করার পর ভগৎ সিং-কে গুলি করার সংকেত প্রদান করবেন। জয় গোপাল ডেপুটি পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট J.P Saunders কে দেখে পুলিশ প্রধান স্কট ভেবে ভগৎ সিং-কে গুলি করার সংকেত দেন। ফলশ্রুতিতে Saunders গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। সামান্য ভুলের কারণে বেঁচে যান পুলিশ প্রধান স্কট। ভগৎ সিং পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্য আত্মগোপনে চলে যান। পুলিশ যাতে তাঁকে চিনতে না পারে সেজন্য তিনি চুল-দাঁড়ি কেটে ফেলেন। কিছু দিন পর তিনি কলকাতায় চলে আসেন। এখানে এসে বাংলার বিপ্লবী যতীন দাসের আশ্রয়ে একটি হোস্টেলে উঠেন। খুব সতর্কতার সাথে বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগ করে পার্টির কাজ অব্যাহত রাখেন।
অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকার বিপ্লবীদের দমনের জন্য পুলিশকে অধিক ক্ষমতা প্রদান করে ভারত প্রতিরক্ষা আইন পাশ করার সমস্ত প্রক্রিয়া চুড়ান্ত করে। ১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে আইনটির অধ্যাদেশ পাশ হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই আইনকে রুখে দেওয়ার জন্য ভগৎ সিং এর ‘হিন্দুস্থান সোসালিস্ট রিপাবলিকান এসোসিয়েশন’ প্রস্তুতি গ্রহণ করে। দলের নেতা ভগৎ সিং- এর নেতৃত্বে সিদ্ধান্ত হয় ৮ এপ্রিল সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে এর প্রতিবাদে বোমা নিক্ষেপ করা হবে। উদ্দেশ্যটা রক্তপাত ঘটানো ছিল না; তাঁরা চেয়েছিলেন, ভগৎ সিং এর ভাষায় ‘বধিরের কানের কাছে আওয়াজ তুলতে’। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত বোমা নিক্ষেপ করবেন আর দলের অন্যরা তাঁদের ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিবেন। ৮ এপ্রিল যথাসময়ে ‘বধিরের কানের কাছে আওয়াজ পৌঁছানোর’ জন্য ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর বোমা নিক্ষেপ করে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ শ্লোগান দেন, যে-আওয়াজ ওইভাবে এর আগে কখনও শোনা যায়নি। পালানোর চেষ্টা না-করে তাঁরা নির্ভয়ে ইস্তাহার বিলি করতে থাকেন। এসময় পুলিশ তাঁদের গ্রেফতার করে।
এই ইস্তাহার হিন্দুস্তান রিপাবলিকান আর্মির নামে প্রকাশিত হয়েছিল এবং তাতে মার্কসবাদের প্রতি সংগঠনের অঙ্গীকার অভিব্যক্ত হয়েছিল, বলা হয়েছিল নতুন একটি মানবিক সমাজ গড়বার প্রয়োজনে তাঁরা যে কোনও শাস্তি সানন্দে গ্রহণ করবেন। তাঁরা ঘোষণা করেছিলেন যে, তাঁদের পথটা গণআন্দোলনের। মামলায় ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত উভয়েই যাবজ্জীবন দীপান্তর দণ্ডে দণ্ডিত হন। কিন্তু তাঁদের দু’জনকে পুলিশ ইনসপেক্টর সান্ডার্সকে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। এই মামলায় প্রমাণাভাবে বটুকেশ্বর দত্ত অব্যাহতি পান। কিন্তু ভগৎ সিং, সুখদেব ও রাজগুরুকে খুনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে জেলে প্রেরণ করা হয়।
জেলে বন্দী থাকা কালে ভগৎ সিং ব্রিটিশ ও ভারতীয় বন্দীদের সমানাধিকারের দাবিতে ৬৪ দিন অনশন করেন। সে সময় ভারতীয় বন্দীদের চেয়ে ব্রিটিশ চোর ও খুনিদের প্রতি অধিকতর ভাল আচরণ করা হত। ৬৪ দিন অনশনের ফলে ব্রিটিশ সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ভগৎ সিং জেলে থাকার সময় ডায়রী লিখতেন। তিনি প্রচুর বই পড়তেন। যে কথাগুলো ভালো লাগত, সেগুলো টুকে রাখতেন নিজের ডায়েরিতে। ১৯৩০-৩১ সালে জেলের মধ্যে ফাঁসির অপেক্ষায় যখন ভগৎ সিং এর দিন কাটছিল সে সময় তিনি ‘why I am An Atheist’ প্রবন্ধটি লিখেছিলেন। ফাঁসির কয়েক মাস পরে ‘The People’ (Lahore, 27 Sept. 1931) নামক পত্রিকায় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়।
১৯৩০ সালের ৭ অক্টোবর। তিন ব্রিটিশ বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত এক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ভগৎ সিং, সুখদেব ও রাজগুরুকে অপরাধী সাব্যস্ত করে এবং ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার রায় প্রদান করে। অবশেষে ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ সন্ধ্যা ৭ টায় এই তিন বিপ্লবীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
সাহসী ভগৎ সিং, সুখদেব ও রাজগুরু- র মুখে চোখে এই সময় কোনও ভয় ছিল না, ছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন। তাঁরা হাসি মুখে, গান গেয়ে ফাঁসির দড়ি বরণ করে নিয়েছিলেন।

No comments:
Post a Comment