কলকাতা শহরেই খোঁজ মিলল এবার করোনা আক্রান্তের। প্রথম করোনা ভাইরাস আক্রান্ত যুবকের সন্ধান মিলল মঙ্গলবার রাতে। নাইসেডের রিপোর্ট আসে রাতে এবং তা পজিটিভ। রাজ্য সরকারের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের পুত্র এই আক্রান্ত যুবক। সম্প্রতি ইংল্যান্ড থেকে তিনি ফিরেছেন। রাতেই তাঁর বাবা-মা-গাড়ির চালককে কোয়ারেন্টাইনে নিয়ে আসা হচ্ছে।
কলকাতা পুলিশের সূত্রগুলি বলছে যে করোনা ভাইরাসের রোগী লন্ডন থেকে কলকাতায় আসার পরে তিনি নিজে বাড়িতে- আলাদা থাকেননি । পরিবর্তে, তিনি শপিংমল, এমআর বাঙ্গুর হাসপাতাল এবং হাওড়া এলাকার স্বজনদের সাথে দেখা করেছেন বলে জানা গেছে। পুলিশ এখন তার সাথে যোগাযোগ করা সমস্ত লোককে সনাক্ত করছে এবং সেই লোকদের সনাক্ত করার চেষ্টা করছে। যাদের সাথে তিনি দিল্লি থেকে কলকাতায় বিমানটি এসেছিলেন।
ভুক্তভোগী দেশে ফেরার পথে মুখোশ পরেন নি বলে জানা গেছে। সূত্রগুলি আরও জানায় যে, তিনি যখন কলকাতা বিমানবন্দরে অবতরণ করেছিলেন, তাঁকে বেলিয়াঘাটা সংক্রামক রোগ (আইডি) হাসপাতালে যেতে বলা হয়েছিল। তবে তিনি 15 বা 16 মার্চ হাসপাতালে যাননি।
লন্ডনের একটি নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পরেই ভুক্তভোগী ছাত্র তাকে পড়াশুনা করে জানিয়েছিল যে তার প্রায় পাঁচজন বন্ধু কোভিড -১৯-এর জন্য ইতিবাচক ফলৈপরীক্ষায় মিলেছে। মঙ্গলবার সকালে বেলিয়াঘাটা আইডি হাসপাতালে গিয়েছিলেন। একই দিন সন্ধ্যায়, তার রিপোর্টগুলি দেখায় যে তিনি করোনভাইরাসটির জন্য ইতিবাচক রোগী । তার বাবা-মা এবং দুই চালককে পৃথক করা হয়েছে। পরিবারটি দক্ষিণ কলকাতার একটি কমপ্লেক্সে থাকে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিদেশ থেকে যে কাউকেই পরীক্ষা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন এবং বলেছিলেন, "কোনও ভিআইপি চিকিত্সা বরদাস্ত করা হবে না। দয়া করে একটি পরীক্ষা নিন WHO ডব্লুএইচওর নির্দেশিকা অনুযায়ী আপনার নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা উচিত। আপনি অন্যকেও সংক্রামিত করতে পারেন না ।"
তিনি আরও যোগ করেছেন, "আপনি যদি মনে করেন যে আপনি অসুস্থ না হয়ে থাকেন তবে অনলাইন মেডিকেল পাতাগুলির জন্য আবেদন করুন ।
তিনি আরও বলেছিলেন যে রাজ্যে যে কোনও স্ক্রিনিং ছাড়াই তিনি হাঁটেন এমন কাউকে তিনি সমর্থন করবেন না।
পশ্চিমবঙ্গে প্রথম করোনভাইরাস মামলার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে মমতা বলেন, "এই ছেলেটি যুক্তরাজ্য থেকে এসেছিল। কেন আমরা পরীক্ষা করব বা কোনও জবাবদিহি করতে পারি না? আমি এই ভিআইপি সংস্কৃতি সহ্য করব না।" তিনি আরও বলেন, ডাক্তাররা তাকে আলাদা থাকতে বলেছিলেন ।
মমতা আরও বলেছিলেন যে যারা এই সময়ে গুজব ছড়ায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেছিলেন যে মারাত্মক ভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কেন্দ্র এবং রাজ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সচিবালয় নবান্নকে জীবাণুমুক্ত করার জন্য স্যানিটাইজেশন ব্যবস্থায় পুরোপুরি পরিস্কার করা হল। নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যালয় রয়েছে। ভবনের সমস্ত মেঝে এবং লিফট স্যানিটাইজ করা হয়। পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনের উচ্চ স্তরের মহিলা আমলা ১৮ বছর বয়সী পুত্র, যিনি ১৫ মার্চ লন্ডন থেকে ফিরে এসে মঙ্গলবার কোভিড -১৯ এর পরীক্ষায় ইতিবাচক ফল মিলেছে ।
অফিসারটির কেবিনটি, যা নং নং ৫১১ নম্বর ইতোমধ্যে পরবর্তী বিজ্ঞপ্তি না হওয়া পর্যন্ত স্যানিটাইজড করার পর বন্ধ করা হয়েছে। নবান্ন সূত্রে জানা গেছে, চতুর্থ তলা থেকে নিচের দিকে স্যানিটাইজেশন প্রক্রিয়া শুরু হয় এদিন। প্রথমে জীবাণুনাশক স্প্রে করা হয় যার পরে পুরো তলটি ফিনাইল জলে ভেসে উঠছে।
বিভিন্ন দরজার হাতল, উইন্ডো নবস এবং গ্রিলগুলি একই পদ্ধতিতে পরিষ্কার করা হয়। এই পরিষ্কার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য চারটি দল তৈরি করা হয়েছে। সূত্র আরও জানিয়েছে, নবান্নে কর্মরত লোকদের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে মাস্ক পরা এবং নিয়মিত বিরতিতে হাত ধোয়া ।
রাজ্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ঐ যুবক কলকাতায় ফিরেছিলেন। নজর রাখা হচ্ছিল। স্বাস্থ্য দপ্তরের তরফে তাঁকে গৃহ-পর্যবেক্ষণে থাকতে বলা হয়। পুলিশের তরফে খোঁজ নিয়ে জানা যায় বিদেশে গিয়ে তিনি যে পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন সেখানে উপস্থিত কয়েকজন করোনা আক্রান্ত ছিলেন। এরপরেই দপ্তরের তরফে তড়িঘড়ি তাঁকে বেলেঘাটা আইডি’তে আইসোলেশনে ভর্তি করা হয়। এদিনই তাঁর লালারস নাইসেডে পাঠানো হয়েছিল। রাতেই আসে রিপোর্ট এবং তা পজিটিভ। কলকাতা শহরে এই প্রথম। রাতেই তড়িঘড়ি স্বাস্থ্য দপ্তর ও পুলিশের তরফে ওই যুবকের বাবা-মা ও গাড়ির চালককে তুলে নিয়ে আসা হয় বেলেঘাটায় আইডি হাসপাতালে। সেখানে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয় তাঁদের। এর মাঝে আর কারো সঙ্গে ওই যুবক যোগাযোগ করেছিলেন কিনা তাও রাতেই খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে পুলিশ প্রশাসন। তবে আক্রান্ত যুবকের শরীরে কোনও উপসর্গ নেই। সে কারণে তাঁর নমুনা আরও একবার পাঠানো হয়েছে পুনের ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজিতে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে এখনও পর্যন্ত ১২হাজার ১৯০ জনকে গৃহ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। হাসপাতালে আইসোলেশনে রয়েছেন ১০জন। সন্দেহজনক ৬২ জনের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। বেলেঘাটা আইডি’তে নতুন করে এক মহিলা নাবিককে ভর্তি করা হয় এদিন। বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ওই মহিলা নাবিক সম্প্রতি জাহাজে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পরেই পোর্ট ট্রাস্টের হাসপাতালে তাঁকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। সেখান থেকেই এদিন তাঁকে বেলেঘাটা আইডি’তে স্থানান্তরিত করা হয়। বেলেঘাটার আইসোলেশন ওয়ার্ডে এছাড়াও আরো পাঁচজন এই মুহূর্তে রয়েছেন। প্রত্যেকের নমুনা ইতিমধ্যে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
সরকারি নির্দেশিকা আর বাস্তবের চেহারা, দুইয়ের ব্যবধান প্রকট হচ্ছে ক্রমশই। তার মধ্যেই জাঁকিয়ে বসছে আতঙ্ক। শহর কলকাতা ছাড়িয়ে গোটা রাজ্যেই প্রতিদিনকার জীবনযাপন প্রায় স্তব্ধ হবার মুখে। সাধারণভাবে রাস্তাঘাট, বাসে ট্রামে মানুষজন কম। দোকানপাটে কোনাবেচা কমছে, আশঙ্কা পরিস্থিতি এগতে পারে কালোবাজারির দিকেও। একইসঙ্গে স্যানিটাইজার, মাস্কের অমিলে বাড়ছে উদ্বেগও।
সেই চেহারা আরও প্রকট হয়েছে মূলত স্বাস্থ্যক্ষেত্রেই। রোগী, রোগীর পরিবার ছাপিয়ে আতঙ্ক, উদ্বেগ দেখা দিচ্ছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে। কলকাতার হাতে গোনা কয়েকটি সরকারি হাসপাতাল ছাড়া জেলায় জেলায় হাসপাতাল, স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরাই পাচ্ছেন না জীবানু প্রতিরোধক এন-৯৫ মাস্ক, পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট। অধিকাংশ জায়গায় নেই হ্যান্ড স্যানিটাইজার। একের পর এক নির্দেশিকায় সচেতনতার পাশাপাশি আতঙ্ক বেড়েছে। একইসঙ্গে তা ঠেকানোর মতো পরিকাঠামোর অভাবও ক্রমেই সামনে আসছে। হাসপাতালে থেকে দিন রাত রোগীর চিকিৎসা করছেন চিকিৎসক, নার্স থেকে স্বাস্থ্যকর্মীরা। তাঁদেরই এখনও জোটেনি জীবাণু ঠেকানোর এন-৯১ মাস্ক এবং সেই চিত্র জেলা হাসপাতালগুলিতে ভয়াবহ। তাতে চিকিৎসকরাও আতঙ্কিত হচ্ছেন। জেলা সরকারি হাসপাতালগুলিতে একাধিক জায়গায় বহির্বিভাগ চলছে, থিকথিকে ভিড় অথচ অধিকাংশের নেই মাস্ক। এক মিটার দূরত্ব রাখার নির্দেশিকা সেখানে কাগজের নির্দেশই! এএইচএসডি’র সাধারণ সম্পাদক ডাঃ মানস গুমটার কথায়, ‘‘হাসপাতালগুলিতে পর্যাপ্ত মাস্ক নেই। হাসপাতালে আসা প্রত্যেক রোগীকে মাস্ক দেওয়া উচিত। প্রবীণেরা একান্ত প্রয়োজন না হলে যাতে হাসপাতালে না আসেন, সে বিষয়েও সচেতনতা গড়ে তোলা উচিত। স্বাস্থ্যকর্মীদেরও মাস্ক পড়া প্রয়োজন। অথচ তা অপ্রতুল, মিলছে না। চিকিৎসকদেরও মাস্ক পড়া প্রয়োজন এবং তা এন-৯৫ প্রয়োজন। কিন্তু অধিকাংশ জায়গায় সার্জিকাল মাস্ক পড়েই কাজ করতে হচ্ছে। ডেন্টাল কলেজগুলির অবস্থা আরও শোচনীয়’’।
ডেন্টাল কলেজগুলিতে আতঙ্কে খোদ চিকিৎসকরাই। ডাঃ আর আহমেদ ডেন্টাল কলেজের একাধিক চিকিৎসক ও মেডিক্যাল ছাত্রদের কথায়, রোগীদের মুখে সরাসরি হাত দিয়েই কাজ করতে হয়। সেক্ষেত্রে জীবাণু ছড়ানোর ব্যাপক সম্ভাবনা। কিন্তু সার্জিক্যল মাস্ক নিয়ে কোনোভাবে চালাতে হচ্ছে। এখানে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। রাজ্যের সরকার নানা নির্দেশিকা জারি করে স্কুল কলেজ অফিস বন্ধ করছে। তাতে মানুষের আতঙ্ক বাড়ছে। কিন্তু আতঙ্ক কমার কোনও পরিকাঠামো নেই রাজ্যের কাছে। সবটাই আসবে, হচ্ছে, হবের মধ্যেই আটকে। কলকাতার হাতে গোনা দু’একটি হাসপাতাল ছাড়া জেলা হাসপাতাল বা ব্লক হাসপাতালে বিধি মেনে নেই আইসোলেশন ওয়ার্ড। শুধু একটি করে ঘর খালি করে তাতে চারটি বেড দিয়ে আইসোলেশন ওয়ার্ড বলা চলে না। মেডিসিন বিভাগ ও বক্ষ বিভাগের চিকিৎসকরাও হাই রিস্ক জোনে আছেন বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা। বিমা করে করোনা আক্রমণ ঠেকানো যায় না। যাঁরা এই রোগের বিরুদ্ধে লড়ছেন ও যাঁরা আক্রান্ত বলে মনে করা হচ্ছে তাঁদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
এমন আবহে কলকাতার আর আহমেদ ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালে এসএফআই’র তরফে অধ্যক্ষের কাছে ডেপুটেশন দেওয়া হয়েছে। দাবি করা হয়েছে প্রথম থেকে ফাইনাল ইয়ার ক্লাস বাতিল করতে হবে। প্রতি বিভাগে পর্যাপ্ত অ্যালকোহল যুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিতে হবে। আউটডোর চিকিৎসকদের সঠিকভাবে প্রপার জেনারেল স্ক্রিনিং করতে হবে। এই দাবিগুলির ভিত্তিতে অধ্যক্ষ আশ্বাস দেন ৩১মার্চ পর্যন্ত ক্লাস হচ্ছে না। বাকি দাবিগুলিও কলেজ কাউন্সিলসভায় গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করা হবে।
সোমবারই সরকারি নির্দেশিকায় জানানো হয়েছিল রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদিত ল্যাবেই করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা করা যাবে। বেলাঘাটা আইডি, কেন্দ্রীয় সংস্থা নাইসেড এবং এসএসকেএম হাসপাতালে একমাত্র এই করোনার পরীক্ষা হচ্ছে। কিন্তু যেভাবে প্রতিদিন চাপ বাড়ছে তাতে রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের একটি সূত্রের দাবি, এবার বেসরকারি ল্যাবের জন্যও দরজা খুলতে হবে। এই মুহূর্তে সরকারি ল্যাবে প্রতিদিন যে পরিমাণে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া সন্দেহে রোগীর লালারসের নমুনা আসছে, তার মধ্যে খুবই কম সংখ্যক নুমনার পরীক্ষা সম্ভব হচ্ছে। ফলে করোনা পরীক্ষা এবং তার ফল জানার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে। উদ্বেগের মাত্রাও বাড়ছে।

No comments:
Post a Comment