নিজস্ব সংবাদদাতাঃ মা ডাক শোনার অনুভূতি সকল কিছুকে ছাপিয়ে যায়। পৃথিবীতে এমন কোন মহিলা নেই যিনি মা ডাক শুনতে চান না। বলাবাহুল্য সেই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও স্কুল শিক্ষা দপ্তরের বাধায় তা হয়ে উঠছিল না। ভরা এজলাসে এমনটাই জানালেন গার্গী দেবী।
মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙ্গার ভাবতা হাসিনা মেমোরিয়াল মাদ্রাসা গার্লস হাই স্কুলে কর্ম শিক্ষার শিক্ষিকা হিসেবে ২০০৩ সালে চাকুরীতে যোগদান করেন এবং ২০১০ সালে আলিপুরদুয়ার জেলার ফালাকাটা ব্লকের পলাশবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা এক স্কুল শিক্ষকের সাথে গার্গী রায়-এর বিয়ে হয় । সে বছরই রাজ্যের স্কুল শিক্ষা দপ্তরের কাছে বদলি চেয়ে আবেদন করেন তিনি। শ্বশুর বাড়ী থেকে মুর্শিদাবাদ এর দূরত্ব ৬৫০ কিলোমিটার। তাই স্কুল করে বাড়ি ফেরা সম্ভব হত না গার্গী দেবীর। এই ভাবেই বিয়ের পর থেকেই দীর্ঘ নয় বছর গার্গী দেবীর সাথে তার স্বামীর সেই অর্থে একসাথে থাকা হয়ে ওঠে না। গার্গী দেবীর স্বামী গিরীন্দ্র নাথ বর্মন আলিপুরদুয়ারের শালকুমার হাটের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তিনিও ছুটির অভাবে অসুস্থ মাকে ছেড়ে মুর্শিদাবাদে স্ত্রীর কাছে এসে থাকতে পারতেন না বলে আদালতে জানান। স্বাভাবিকভাবেই দুজনের সাথে দুজনের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্নই হয়ে গিয়েছিল।
স্কুল শিক্ষিকা নিজের জেলায় বদলি চেয়ে গত পাঁচ বছর ধরে লাগাতার একের পর এক আবেদন জানায় রাজ্যের স্কুল শিক্ষা দপ্তরে। কিন্তু গার্গী দেবীর আহবানে একেবারেই সাড়া দেয়নি রাজ্যের স্কুল শিক্ষা দপ্তর। তার আবেদন খারিজ করে দেন স্কুল শিক্ষা দপ্তর। স্বামী স্ত্রী দুজনেই ভিন্ন জেলায় থাকেন এবং সেই কারণেই তাদের কোন রকম সন্তান হয়নি। গার্গী দেবী একাধিক স্ত্রী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পরামর্শ করেছেন যাতে করে তিনি মা হতে পারেন। কিন্তু চিকিৎসকরা জানিয়েছেন স্বামী স্ত্রীকে একসাথে থাকতে হবে এবং তাদের দুজনকে একসাথে চিকিৎসা করাতে হবে। চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে বেশ কয়েকবার স্কুল শিক্ষা দপ্তরের কাছে আবেদন জানান গার্গী দেবী কিন্তু সেই আবেদনেরও কোন উত্তর পাননি তিনি। দিনের-পর-দিন এভাবেই স্বামীর সাথে আলাদা থাকা এবং সন্তান না হওয়ায় মানসিক অবসাদে চলে যান গার্গী দেবী। নিরুপায় হয়ে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন গার্গী দেবী।
মামলার শুনানি চলাকালীন আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী আশীষ কুমার চৌধুরী আদালতে জানান, একজন মহিলার মা হতে না পারা কি যন্ত্রনা তার অনুভব একমাত্র একজন মহিলা বোধ করতে পারেন। বিবাহের নয় বছর স্বামী থাকা সত্ত্বেও তিনি স্বামীর সাথে থাকতে পারছেন না। আইন অনুযায়ী একজন শিক্ষক বা শিক্ষিকা তিনি যদি কোন স্কুলে টানা পাঁচ বছর চাকরি করেন, সে ক্ষেত্রে তিনি স্পেশাল গ্রাউন্ডে বদলির আবেদন করতেই পারেন এবং মেডিকেল গ্রাউন্ডে শিক্ষক বা শিক্ষিকা বদলির আবেদন করেন তাহলে আইন অনুযায়ী স্কুল শিক্ষা দপ্তর সেই নির্দেশ দিতে পারেন, যেখানে গার্গী দেবীর ক্ষেত্রে রাজ্যের স্কুল শিক্ষা দপ্তর নিশ্চুপ ছিলেন।
অবশেষে বুধবার হাইকোর্টের বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজের নির্দেশে গার্গী দেবীকে মাদ্রাসা স্কুলের বদলে তুফানগঞ্জ এর ইলা দেবী গার্লস হাই স্কুল বদলির অনুমোদন দেন স্কুল শিক্ষা দপ্তর।

No comments:
Post a Comment