টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে আজ শনিবার দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারের নির্বাচন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের জন্য অগ্নিপরীক্ষা। সেই সঙ্গে ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে বিজেপি। নাগরিকত্ব আইন, এনআরসি সহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্কের মধ্যে দিল্লির ভোটকে বিজেপির জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জে বিজেপির সামনে বড় বাধা কেজরিওয়াল। তার আছে গণমানুষের ভালোবাসা। নাগরিক সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে তিনি এখন জনপ্রিয় মুখ। ফলে সাফল্য পাওয়া যে সহজ হবে না, তা বুঝেই বিজেপির হয়ে মাঠে নামেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর মতো বাঘা বাঘা নেতা। তবে তাতে কি বিজেপির মুখ রক্ষা হবে, তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে মঙ্গলবার ফল ঘোষণা পর্যন্ত।
এদিকে ট্যুইটারে এক ভিডিও পোস্ট করায় ভোটের আগের দিন অর্থাৎ গতকাল কেজরিওয়ালকে শোকজ নোটিশ পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এ নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বিরোধী দল ও গণমাধ্যম শুধু 'হিন্দু-মুসলিম', 'মন্দির-মসজিদ' এবং 'সিএএ' নিয়েই আলোচনায় ব্যস্ত। অন্যদিকে উন্নয়ন, স্কুল এবং নারী সুরক্ষার মতো বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন কেজরিওয়াল। এ ধরনের ভিডিওতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আজ বিকেল ৫টার মধ্যে তাকে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
দিল্লিতে কেজরিওয়াল ফ্যাক্টর হয়ে ওঠেন ২০১৩ সালে। দীর্ঘদিন জিইয়ে থাকা দিল্লির নাগরিক সমস্যাগুলো সবার সামনে আনতে সক্ষম হন তিনি। তার সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্ত হন মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড় একটি অংশ। তাদের সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনে নামেন কেজরিওয়াল। আর তাতেই পতন ঘটে দিল্লিতে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেসের। দলটির হেভিওয়েট নেত্রী ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী শিলা দীক্ষিত পরাজিত হন ভোটের মাঠে নতুন মুখ কেজরিওয়ালের কাছে। সেই থেকে তার জনপ্রিয়তা বিজেপির জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে রেখেছে। কংগ্রেসকে খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে বিজেপির ব্যাপক উত্থানের মধ্যেও কেজরিওয়াল ঠিকই উন্নয়নের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে মানুষের কাছাকাছি থেকেছেন।
প্রথমবার দিল্লিতে নির্বাচন করে বিধানসভার ৭০ আসনের মধ্যে ২৮টিতে জয় পায় কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি। সেবার ৩১ আসন নিয়ে বিজেপি একক গরিষ্ঠতা পায়। তবে কেজরিওয়ালের সঙ্গে তারা সরকার গঠন করেনি। ব্যাপক ভরাডুবি হওয়া কংগ্রেস পেয়েছিল আট আসন। কেজরিওয়াল সরকার গঠনে কংগ্রেসের সমর্থন পান। প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হন কেজরিওয়াল। তবে তার সরকার মাত্র ৪৯ দিন টিকেছিল।
দ্বিতীয় দফায় নির্বাচনে এককভাবে বিধানসভায় ভূমিধস জয় পায় আম আদমি পার্টি। ৭০ আসনের মধ্যে ৬৭টিতেই জিতে ইতিহাস তৈরি করেন কেজরিওয়াল। কংগ্রেস একটি আসনও তখন পায়নি। আর বাকি তিন আসন পেয়েছিল বিজেপি। তখন বোঝা যায়, দিল্লির মানুষ বড় বড় রাজনৈতিক দলের গালভরা প্রতিশ্রুতির চেয়ে উন্নয়নকর্মী কেজরিওয়ালকেই তাদের মানুষ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। সেই থেকে বিজেপি ও কংগ্রেস দিল্লিতে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি। তবে এবার দিল্লির দখলে যেতে চায় বিজেপি। তাই তো তারা বিভিন্ন রাজ্য থেকে জনপ্রিয় মুখ্যমন্ত্রীদের এনে ভোটের মাঠে নামিয়েছেন। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ উগ্র হিন্দুত্ববাদের জনপ্রিয় বক্তা। তাকে দিল্লির ভোটের মাঠে কাজে লাগিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ জুটি। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারও এ শোডাউনে বিজেপির হয়ে জনসভা করেছেন। আরও দেখা গেছে, বিভিন্ন রাজ্যের নেতাদের। তবে গত দু'বারের মতো এবারও কংগ্রেস দিল্লিতে দ্বিতীয় নয় বরং তৃতীয় শক্তির মতোই ঝিমিয়ে রয়েছে।
দিল্লি প্রায় দেড় কোটি ভোটারের শহর। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহদের জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমে মজে বিজেপিকে ভোট দেবেন, নাকি কেজরিওয়ালের উন্নয়নের ওপর আস্থা রাখবেন, তার ফয়সালা হবে আজ। কেজরিওয়ালের ভাষায়, বিজেপি নেতারা 'ভুয়া হিন্দু'। 'হিন্দু-মুসলিম জিগির তুলে তারা ভারতকে ২০০ বছর পেছনে নিয়ে গেছেন। জনগণ তাদের নোংরা রাজনীতির বিষয়ে সচেতন।' কেজরিওয়ালের যখন এমন অভিযোগ, তখন নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিন বৃহস্পতিবার অমিত শাহ বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রী 'ভুয়া প্রতিশ্রুতি' বাদ দিয়ে দিল্লির মানুষ এবার বিজেপিকে ভোট দেবেন। ৪৫টির বেশি আসন নিয়ে সরকার গঠন করবে বিজেপি। দু'পক্ষের এই বিতর্কের অবসান হবে মঙ্গলবার ফল ঘোষণার মধ্য দিয়ে। বলতে গেলে, ওই ফল থেকে স্পষ্ট হয়ে যাবে বিজেপি তথা মোদি-অমিত জুটির ওপর ভরসার জায়গা বাড়ছে না কমছে।
সূত্র: সমকাল

No comments:
Post a Comment