নিজস্ব প্রতিবেদনঃ--
ভালোবেসে ভালো থাকতে তো আমরা সকলেই চাই। কিন্তু সবসময় কি পাওনার ডালি নিয়ে হাজির হয় সে! হয় না, না পাওয়া নিয়েই যে এর বেশি কাজ। সেই সাথে সমাজের কিছু চোখ রাঙানি, কিছু বাজে তকমা সেটে দেওয়া- এই তো ভালোবাসার জগৎ। অনেক সময় কানে ভেসে আসে, " অমুকের ভালোবাসা, আরে না না, ওটা তো অবৈধ এক কাজ।" কিন্তু ভালোবাসা কি আদৌ কখনও অবৈধ হয়? সেই আলোচনা নিয়ে আজ এই লেখা।
বৈধ অবৈধতার তর্ক বিতর্কের আগে ভালোবাসার কাছাকাছি একটা সংজ্ঞা জানা অবশ্যই প্রয়োজন। ভালোবাসার ব্যাখ্যা মনীষীরা বহুবার বহুভাবে দিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি তাঁরা ব্যক্ত করেছেন। আমি এক অতি সাধারণ মানুষ। আমার কাছে ভালোবাসার সংজ্ঞা অবশ্যই তাঁদের থেকে ভিন্ন হবে, যা সম্পূর্ণই আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা লব্ধ। আর সেই ভালোবাসার সংজ্ঞায় রয়েছে পাওয়া আর না পাওয়ার এক আজব মেলবন্ধন। আমার কাছে ভালোবাসা এমন একটি সাগর, যার গর্ভে পুরো বিশ্ব তলিয়ে যেতে পারে। এমন এক অনুভূতি, যা মুহুর্তেই হাসিয়ে যায়, আবার এক পলকেই ভিজিয়ে দেয় চোখের পাতা।
এ তো গেল প্রেম বা ভালোবাসার সংজ্ঞা নিয়ে কিছু কথা। এবার আসি এই ভালোবাসা কখন, কীভাবে জীবনে প্রবেশ করে। ভালোবাসা প্রবেশ করার তেমন নির্দিষ্ট বয়স বা দিন-ক্ষণ কিছুই নেই। আর এই অভিজ্ঞতা কম-বেশি সকলেরই আছে। হতে পারে সদ্য যৌবনের দোরগোড়ায় পা রাখা কিশোর-কিশোরীর জীবনে কড়া নাড়ল প্রেম, আবার যৌবনের মাঝামাঝি, না হয় যৌবন পেরিয়ে দেখা মিলল প্রেম বা ভালোবাসার।
এখন আসা যাক ভালোবাসায় সফলতা নিয়ে কয়েকটি বিষয়ে। ভালোবাসা কারও মনকে নাড়া দেয়নি, এমন মানুষ খুঁজলে খুব কম পাওয়া যাবে। তবে কেউ প্রকাশ করে, আবার কেউ আড়াল থেকেই প্রিয় মানুষটিকে ভালোবেসে যান। ভালোবাসা যখন সফলতা পায় তখন সেই যুগলের থেকে বেশি খুশি আর কেউ হয় না। আবার এমনটাও তো হয়, ব্যর্থ প্রেম কতজনের হৃদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ করে। কেউ নিজেকে সামলে নেয়, আবার কেউ ব্যর্থতা কে সঙ্গী করে জীবন কাটায়, না হয় জীবনটাই শেষ করে দেয়।
এটা হল প্রেমের প্রাথমিক ধ্যান-ধারনা। মূল কথায় আসা যাক- আগেই বলেছি জীবনে ভালোবাসা প্রবেশের কোণও নির্দিষ্ট সময় নেই। সেভাবেই কখন কাকে কোথায় মন আপন করে নেয় সে নিজেই জানে না। যখন কোন যুগল দীর্ঘদিন ভালোবাসার পরেও বিয়ে পর্যন্ত সম্পর্ক টা গড়ায় না, সেই মানুষটির ভালোবাসা আকড়ে পরে থাকে। এরপর হঠাৎ সেই মানুষটির সাথে আবার দেখা হয়ে গেলে পুরোনো স্মৃতি নতুন করে উঁকি দেয়, তখন উভয়েই চায় কিছুটা একান্তে সময় কাটাতে। ব্যস এখান থেকেই শুরু হয়ে যায় বৈধ আর অবৈধতার টানাপোড়েন। হয়ত তাদের এই সম্পর্কে মনের চাহিদাটা প্রবল, শরীর সেখানে কথা বলে না। কিন্তু সমাজের কুদৃষ্টি সেই সম্পর্কের মাঝে অবৈধ তকমাটা ঠিক জুড়ে দেয়। কারণ এই সমাজের চোখে বিবাহিত নারী পুরুষের সম্পর্ক মানেই ধরে নেওয়া হয় তারা অবৈধ কাজকর্মে লিপ্ত। অথচ সবসময় এটা সত্য নয়। তাদের মাঝেও নিখাদ ভালোবাসা থাকতে পারে। আর ভালোবাসা কখনও অবৈধ হতে পারে না। যদি এই ভালোবাসার সম্পর্ক টা অবৈধ হয়, তবে যখন জোড় করে অপছন্দের মানুষের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়, আর ঐ অপরিচিত ব্যক্তির সাথে শয্যা ভাগ করে নিতে হয়, তখন সেটা কি অবৈধ নয়! বলবেন বিয়ে হয়েছে তো, তাহলে কেন অবৈধ? কিন্তু ভেবে বলুন তো, বিয়ের আসল অর্থ কি? বিয়ের মানে কি কেবলই দুটো শরীর জুড়ে দেওয়া! "যদিদং হৃদয়ং তব, তদিদং হৃদয়ং মম।" - এই একটা মন্ত্র উচ্চারণ করলেই বিয়ে হয়ে গেল! তাহলে এই যে আমরা মন হৃদয় বলে এত চিৎকার করি, তার ভূমিকাটা কোথায়! আসলে বিয়ে কেবল দুটো শরীরের বন্ধন হতে পারে না। যখন দুটো মন এক হবে, সেখানেই বিয়ের সার্থকতা। মন যেখানে কথা বলে শরীর অনায়াসেই সেখানে ধরা দেয়। কিন্তু শরীর বাঁধলেই যে মনও কথা বলবে তেমনটা নয়। আর অবৈধতার প্রশ্ন আসে ঠিক এই সময়। ভালোবাসা অবৈধ নয়, অবৈধতার সীমানা এটা তখনই পার করে যখন সমাজের দৃষ্টি সেই সম্পর্ক টা ভিন্ন চোখে দেখে। এমন অনেক সময় জানা যায়, দুজন মানুষ ভালোবেসেছেন, সেখানে মনের গণ্ডি পেরিয়ে শরীরও ধরা দিয়েছে, আর তার পর এক ফুটফুটে অতিথি এসেছে তার ঘরে। অথচ তারা বিবাহিত নয়, হতে পারে কোনও কারন বশত পুরুষটি মেনে নেয়নি তাদের, হতে পারে সে আবেগের বশে কাজটি করে ফেলেছে। তাই সেই নতুন অতিথি ও তার মাকে আপন করে নেয়নি, বা হতে পারে কোনও অন্য ঘটনা, ছেড়ে দিলাম সে প্রসঙ্গ। আমার আলোচ্য বিষয় হল, যাদের সে অস্বীকার করল তাদের কথা। সমাজ খুব সহজেই তাদের অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেবে।বলবে অবৈধ সম্পর্ক ও তারই পরিণতি এই শিশু। কিন্তু শিশুটির কি দোষ! সে তো আর পাঁচজনের মতই প্রকৃতির নিয়ম মেনেই তার মায়ের কোল আলো করে এসেছে। আর সেই নারীটিরই বা দোষ কোথায়! সেও তো ভালোবাসার মানুষটিকে মনে প্রাণে ভালোবেসে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল। তার ভালোবাসা কিন্তু অবৈধ ছিল না। হ্যাঁ তার সেই ভালোবাসার মানুষটি ঠিক ছিল না হয়ত, বা তার কোনও বাধা হয়তো তাকে আটকে দিয়েছিল। তবে ভালোবাসাটা অবৈধ ছিল না।
আসলে ভালোবাসা কখনও অবৈধ হতে পারে না। এ অনুভূতিটাই এমন যে, এর স্পর্শে সর্বদা সিক্ত হয় হৃদয়। মৃদু এক আলোড়ন মনকে নাড়া দিয়ে যায়। তবে এখানে পাওয়ার আশা করা বৃথা। নিঃস্বার্থ ভাবে কেবল দিয়ে যাওয়াটাই আসল। কিন্তু এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে ভালোবাসা যতই মনে তুফান বা সুনামি তুলুক না কেন, সেটা আছড়ে যেন মনের ঘরেই দাগ কাটে, অপরের ধ্বংসের কারণ যেন না হয়ে দাঁড়ায়। তাই বেশি ভাবনা চিন্তা না করে, প্রেমের সাগরে একবার গা ভাসিয়েই দেখুন। এই সাগরের জল যতই নোনা হোক না কেন, জীবনটা মিষ্টতা দিয়েই ভরে তুলবে।

No comments:
Post a Comment