বিশেষ প্রতিবেদনঃ
আজকের প্রতিবেদনের মধ্যমণি হলেন ঘরের সেই সদস্য, যিনি হাজার কঠিনতার মধ্যেও সব কিছু ঠিক সামলে নেন।
আশেপাশে আত্মীয় স্বজন বলুন আর বন্ধু বান্ধব সকলের মুখে শুনে এসেছি, পুরুষ মানেই কঠিন প্রান। তাদের শরীরে মায়া দয়া খুব একটা নেই। তাদের কষ্ট হয় না। তারা না কি কাঁদে না। আর অমিতাভের সেই বিখ্যাত সংলাপটা ভুলে যাননি কেউ নিশ্চয়ই। সেই যে -- "মর্দ কো দর্দ নেহি হোতা।"
সত্যিই কি তাই! সত্যিই কি পুরুষ হৃদয়ে কোনও ব্যথা নামক অনুভূতি নেই? তাদের কি কষ্ট হয় না! একটু ভেবে দেখুন তো, ছোট্ট বালকটি কি কোনদিন তার প্রিয় খেলনাটির জন্য চোখ ভেজায়নি! বলবেন সে তো ছোট, তার কথা ধরার নয়। বেশ ধরে নিলাম। তাহলে কিশোর জীবনে প্রবেশ করা যাক। প্রথম প্রথম স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজ পরিসরে পা রাখা। নতুন নতুন বন্ধু, তার সাথে কিছু নতুন বান্ধবীও। তারই মধ্যে থেকে কোনও বিশেষ একজনের জন্য একটু আলাদা কিছু অনুভূতি। প্রথম প্রথম লুকিয়ে দেখা, তারপর একটু একটু করে কাছে আসা, প্রেম নিবেদন, সেই প্রেমে সাড়া পাওয়া। বেশ কাছাকাছি আসা। কিন্তু এরপরই যখন মেয়েটি মুখ ভার করে বলে, " দেখ তোর আর আমার সম্পর্ক টা কেউ মেনে নেবে না। তাই আমাদের আর দেখা না হওয়াই ভালো।" তখন কি সত্যিই ছেলেটির হৃদয়ের আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে যায় না! আকুতি মিনতি করে বলে, " তুই প্লিজ আমাকে ছেড়ে যাস না, আমি যেভাবেই হোক একটা কাজ জোগাড় করে নেব, শুধু তুই পাশে থাক। আমায় ছেড়ে যাস না। " এরপরেও মেয়েটি চলে যায়। ভেবে বসে ছেলে তো,দুদিনেই ভুলে যাবে। আর ছেলেটি, সে কি ভুলে যায়! না এখান থেকেই শুরু হয় তার সংঘর্ষ। প্রথম দিকে লাল জলের আশ্রয় নেয়, সাথে নিকোটিনে পোড়ায় নিজের ঠোঁট, আর ফুসফুস ভরে কালো ধোঁয়ায়। আর রাত বাড়তেই যখন যন্ত্রনার পারদ চড়ে, নেশাও সাথ ছেড়ে যায়, তখন সকলের আড়ালে বালিশ ভেজায় চোখের নোনা জলে!
কেন করে? ছেলেদের তো কষ্ট হয় না! তবে কেন করে???
এইভাবেই কঠোর বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে নিজের প্রথম সুখ বিসর্জন দিয়ে লেগে যায় জীবনের স্রোতে এগিয়ে যেতে। একটা চাকরির চেষ্টা, পরিবারের সকলের জন্য সবটা করে ফেলার চেষ্টা, তারই মাঝে নিজের কষ্টগুলো চেপে রাখার চেষ্টা। সময় বয়ে যায়, বাড়ীর সকলের কথা রাখতে আবার কিছুটা প্রকৃতির নিয়মের বলতে পারেন, আবদ্ধ হয় বিয়ের বন্ধনে। শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়। স্ত্রী, সংসারের চাপে পড়ে ভুলেই যায় তারও একটা স্বপ্ন ছিল, কষ্ট ছিল। আর এভাবেই আরও কঠিন হৃদয়ের মানুষ হয়ে ওঠে।
এরপর সংসারে আসে নতুন অতিথি। স্বপ্ন দেখে তাকে বড় করে তোলার, সবটুকু দিয়ে আগলে রাখার। উজার করে দেয় সবটা। কারণ সে তখন কারও বাবা। একটু ভেবে দেখুন বাবারা কতটা কষ্ট সহ্য করে তার সন্তানের জন্য সবটা দিতে পারে। যার ছায়ায় আমরা নিজেদের সবচেয়ে সুরক্ষিত অনুভব করি। আর তিনি হাজার ঝড় ঝাপটা সামলে আমাদের আগলে রাখেন। এই কষ্ট সহ্য করা বাবাও কিন্তু একজন পুরুষ। তাহলে তিনি কেন এত কষ্ট করেন! না করলেই তো পারতেন। তাই না?
আর একটু ধাপ এগিয়ে যাই, বৃদ্ধ বয়সে এই পুরুষটি যখন সংসারে সকলের কাছে অবহেলিত হয়, ঘৃণার পাত্র হয়ে ওঠে। কষ্টটা কিন্তু তখনও হয়। তখনও কিন্তু সবার অলক্ষ্যে এই পুরুষটিই চোখের জল ফেলে, হ্যাঁ আমরা হয়তো খেয়াল করি না। করার কথাও নয়। কারণ আমাদের মনে শুরু থেকেই একটা কথা ঘর করে নিয়েছে পুরুষ মানেই সে আবেগহীন, তার তথাকথিত কষ্ট নামক কোন অনুভূতি নেই।
একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, পাশে থাকা পুরুষটিও কাঁদে। কখনও নিজের ছেলেকে খেয়াল করবেন, প্রেমে ব্যর্থ হলে চোখের জলে সেও হাজার আকিবুকি কাটে। খেয়াল করবেন স্বামীর দিকে- কোনও কিছুর ব্যর্থতায় রাতের আঁধারে তার চোখও জলে ভেজে। খেয়াল করবেন ভাই এর প্রতি, কখনও সেই ছেলেটিও এক বুক কষ্ট নিয়ে ঘুরে বেড়ায় হাসি মুখে। সারাদিন খেটে জুতোর শুকতলা ক্ষয় করে সন্তান ও পরিবারের জন্য তিল তিল করে সুখ খুঁজে আনতে বাবার চোখ কতটা লবণাক্ত হয়।
তাই বলছি, পুরুষ মানেই কঠিন প্রান, কঠিন আত্মা নয়। তারাও চায় কেউ তাদের এই দিকটা সম্পর্কে জানুক, একটু বুঝুক। অভিযোগ না করে তাকে কাছে টেনে নিক। কেবল তারা প্রকাশ করতে পারে না তাদের অনুভূতি। অতএব বন্ধুগণ, " মর্দ কো ভি দর্দ হোতা হ্যায়"।
তাই চলচিত্রের সংলাপটা অতটা গায়ে মাখার কোনও প্রয়োজন নেই। বাস্তব কিন্তু অন্য কথা বলে। তাই বদ্ধমূল ধারণা ত্যাগ করে, ঘরের পুরুষটির পাশে দাঁড়ান।
আর হ্যাঁ পুরুষদের উদ্দেশ্যে একটা কথা, সবসময় জোড় করে হাসি হাসি মুখ নিয়ে ঘোরার অভিনয়টা নাই বা করলেন। অপর পক্ষ না বুঝলে নিজেই না হয় খুলে বলুন মনের কথা। এতে আপনাদের পৌরুষত্বে আঘাত লাগবে না বরং জীবনটা অনেক বেশি সহজ হয়ে যাবে। যদি কষ্ট হয়- বলুন,, যদি বুকের বাম পাশটা যন্ত্রনায় কাতর হয়, বা গলার কাছটা ভারি হয়ে আসে তাহলে প্রিয় মানুষটির সামনেই না হয় কাঁদুন একটু। সবসময় একগুঁয়েমি নাই বা দেখালেন, কঠিন নাই বা হলেন, আরে দিনের শেষে আপনিও তো একজন রক্ত মাংসে গড়া মানুষ, তাই নয় কি!!

No comments:
Post a Comment