শাসক তৃণমূলের নিস্ক্রিয়তায় ফিরল লাল তান্ডব। বাম পতনের পর এদিনই প্রথম বনধ সফল করতে পারল বামেরা। নাগরিক সমাজ এই বনধের সৌজন্যে একটা ছুটি কাটালেও জনসাধারণের একাংশের পথে নামার সাহসে তান্ডব আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করতে পারল বামেরা। সরকারী কর্মচারীদের অনেকেই অফিসে হাজিরা দিয়ে বনধকে সমর্থন করল কার্যালয়ের দরজায় তালা ঝুলিয়ে। আর সেই তালা ভেঙে জনসাধারণ জানিয়ে দিল বনধ আদতে নাগরিক জীবনের ধ্বংসের সমার্থক।
মধ্যমগ্রাম হয়ে বারাসত থেকে হাবড়া কোথাও অটো এবং বাস থেকে জোর করে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া, কোথাও সরকারি বাসের চাকার হাওয়া খুলে দেওয়া, আবার কোথাও রেল লাইনের মাঝে বোমার মতো কিছু রেখে দিয়ে একই সাথে ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে সাধারন রেল যাত্রীদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে দেওয়া চেষ্টার ছবি ধরা পড়েছে এদিন। শিয়ালদহ-বনগাঁ শাখার মধ্যমগ্রাম, বারাসত থেকে হাবরা, অশোকনগর, গোবরডাঙ্গা এবং মছলন্দপুরে একই সাথে রেল এবং যশোর রোড অবরোধ করে এদিন বন্ধের সকালের দিকে কয়েক ঘন্টা কার্যত তান্ডব চালালো বনধ সমর্থনকারীরা। এদিন বনধকে কেন্দ্র করে জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা দেখা দেয় জেলা সদর বারাসতেই। কিন্তু এতসবের মধ্যেও বনধ সমর্থনকারীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই মোটের উপর জন জীবন স্বাভাবিকই ছিল। বেসরকারি রুটের বাস অন্যান্য দিনের মতো না চললেও সরকারি বাসের সংখ্যা ছিল এদিন পর্যাপ্ত। জেলার অটো, টোটো চলাচল করেছে স্বাভাবিক। কিন্তু এদিনের বন্ধে অধিকাংশ দোকানপাট ছিল বন্ধ।
বাম এবং কংগ্রেসের ডাকা ধর্মঘটে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা ছিল বারাসতেই। এখানে দফায় দফায় অশান্তি হয়েছে সকালের দিকে। এদিন সাত সকালেই বারাসতের হেলাবটতলা বাজারে একটা ড্রামের ভিতর থেকে দুটি কৌটো বোমা জাতীয় উদ্ধার ঘিরে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে পুলিশ এসে সেগুলো উদ্ধার করে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই বারাসত এবং হৃদয়পুর স্টেশনের মাঝে ১১ নম্বর রেলগেট সংলগ্ন শিয়ালদহ গামি দুটি রেল লাইনের মাঝে চারটি তাজা বোমা উদ্ধার হয়েছে বলে চাঞ্চল্য ছড়ায়। বোমগুলি রাখা ছিল একটা ড্রামে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এদিন সকাল ৬ টা ২৫ মিনিট নাগাদ দত্তপুকুর শিয়ালদহ লোকাল বারাসত ছেড়ে হৃদয়পুরে আসছিল। সেই সময়েই চারটি বোমা উদ্ধার হওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরী হয়। চালকের কাছে খবর পৌঁছানোর সাথে সাথেই দত্তপুকুর লোকাল দাঁড়িয়ে পড়ে। বোমাতংক ছড়িয়ে পড়ে রেল যাত্রীদের মধ্যে। পরে জি আর পি এবং রেল পুলিশ এসে সেগুলো উদ্ধার করে। স্থানীয়দের অবশ্য দাবি, এগুলো বোম ছিল। যদিও বারাসতের জি আর পি সূত্রে জানা গেছে চারটি সুতোর বান্ডিল পাওয়া গেছে, বোম ছিল না। বারাসত থানার পুলিশ জানিয়েছে হেলাবটতলা মোড়ে কৌটোর মধ্যে থেকে কিছু পাথর উদ্ধার হয়েছে।
এদিন সকালেই বনধের সমর্থনে মিছিল করে বাম কংগ্রেস নেতৃত্ব। মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন ফরওয়ার্ড ব্লকের জেলা সম্পাদক সঞ্জীব চ্যাটার্জি, সিপিএম নেতা দেবব্রত বসু সহ কংগ্রেস নেতা সজল দে। বন্ধ সমর্থনকারীরা চাপাডালি মোড় প্রায় আধ ঘন্টা অবরোধ করেন। এর ফলে যশোর রোড এবং টাকি রোড অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। আগে থেকেই সেখানে প্রচুর পুলিশ এবং র্যাফ মজুত ছিল। পরে পুলিশ অবরোধ তুলে দেয়। সেখান থেকে বাম-কংগ্রেসের মিছিল এগিয়ে চলে বারাসতের ডাকবাংলোর দিকে। মিছিল যশোর রোড ধরে শেঠপুকুর পৌঁছতেই অটো এবং বাস থেকে সাধারন যাত্রীদের জোর করে নামিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বনধ সমর্থনকারীদের বিরুদ্ধে। সেখানে পুলিশ পৌঁছে বাধা দিতে গেলে মাত্রই শুরু হয় পুলিশ এবং বনধ সমর্থনকারীদের মধ্যে বচসা। এক প্রস্থ ধ্বস্তাধস্তিও হয় পুলিশ এবং বনধ সমর্থনকারীদের মধ্যে। ফলে উত্তেজনা তৈরী হয় বারাসতে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে।
এরপর বনধ সমর্থনকারীরা মিছিল নিয়ে চলে আসে ডাকবাংলো মোড়ে। সেখানেও কিছুক্ষন অবরোধ করার ফলে একই সাথে যশোর রোড এবং ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে যায়। এখানেও ট্রাক চালকদের গাড়ি থেকে জোর করে নামিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বনধ সমর্থনকারীদের বিরুদ্ধে। এরপর ১১ নম্বর রেলগেট, কলোনি মোড়, হেলাবটতলা হয়ে বাম এবং কংগ্রেসের মিছিল গিয়ে শেষ হয় চাপাডালিতে। এদিন আমডাঙ্গায় ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক এবং দত্তপুকুর থানার কাজিপাড়াতেও বনধ সমর্থনকারীরা রাস্তা অবরোধ করেছেন। এদিন সীমান্ত শহরে শুধু মাত্র বনগাঁ চাকদহ রুটের বাস চলাচল বন্ধ থাকলেও বনগাঁ শহরে বনধের তেমন কোন প্রভাব পড়ে নি। বাস পরিসেবা মোটের উপর স্বাভাবিক ছিল। তবে পেট্রাপোল সীমান্তে বন্ধের মিশ্র প্রভাব দেখা গেছে। এদিন সকালের দিকে হাতে গোনা ১০ থেকে ১২ টি পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশে রপ্তানির জন্য ঢুকেছে। এদিন জেলার বেশ কয়েকটি জায়গায় রেল এবং রাস্তা অবরোধের জেরে যাত্রী পারাপার অন্যান্য দিনের তুলনায় কম হয়েছে। এছাড়াও পেট্রাপোল থেকে বাস পরিসেবা বন্ধ থাকায় বাংলাদেশ থেকে আসা যাত্রীরা পেট্রাপোলেই আটকে ছিলেন দীর্ঘক্ষন। যদিও পেট্রাপোল সীমান্তের শুল্ক দপ্তরের ক্লিয়ারিং এজেন্টের সম্পাদক কার্ত্তিক চক্রবর্তী বলেন, শীতের কারনে সকালের দিকে আমদানি কম হয়েছে। কিন্তু বেলা বারার সাথে সাথে আমদানি-রপ্তানি বানিজ্য স্বাভাবিক হয়েছে। বনধের কোন প্রভাব নেই পেট্রাপোল সীমান্তে।
এদিন দেগঙ্গা থানার হাড়োয়া স্টেশনে রেল অবরোধ করেন বনধ সমর্থনকারীরা। এর পর বন্ধ সমর্থনকারীরা মিছিল করে হামাদামা বাজারের দিকে চলে আসে। সেই সময় বনধের বিরুদ্ধে পাল্টা মিছিল করে স্থানীয় তৃণমুল নেতৃত্ব। দুটি মিছিল মুখোমুখি চলে আসায় উত্তেজনা তৈরী হয়। দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি মারামারি হয়েছে। কিছু ক্ষনের মধ্যেই অবশ্য দেগঙ্গা থানার পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে।
এদিন বনধ ঘিরে উত্তেজনা দেখা দেয় বারাসত শেঠপুকুর সংলগ্ন মুখ্য ডাকঘরে। আধার কার্ডের হেয়ারিংয়ের জন্য প্রচুর মানুষ অনেক আগে থেকেই জড়ো হয়েছিলেন মুখ্য ডাকঘরের সামনে। আনুমানিক সকাল ১০ টায় ডাকঘরের কর্মীরা গেটের তালা খুলে ফের লাগিয়ে দেন। কিন্তু হেয়ারিংয়ের কাজ না হওয়ায় ধৈর্য হারান সাধারন গ্রাহকরা। তারা মুখ্য ডাকঘরের সামনেই ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। শেষে সাধারন গ্রাহকরাই গেটের তালা ভেঙে মুখ্য ডাকঘরে ঢুকে পড়েন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এদিন বারাসতের মুখ্য ডাকঘরে উত্তেজনা তৈরী হয়। গ্রাহকদের অভিযোগ, বন্ধের দিনে ডাকঘরের কর্মীরা হাজিরা দিলেও কাজে অনিহা দেখান। তারা গেটে তালা লাগিয়ে অফিসের ভিতরেই ছিলেন। পরে অবশ্য বারাসত থানার পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে।
এদিন মধ্যমগ্রামে বনধের সমর্থনে মিছিল করে বামেরা। সিপিএমের জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য আহমেদ খান মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন। বনধের বিরুদ্ধে পাল্টা মিছিলও দেখা গেছে মধ্যমগ্রামে। তৃণমূলের মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান প্রকাশ রাহা। মিছিল এবং পাল্টা মিছিলে সরগরম হয়ে পড়ে মধ্যমগ্রাম । মধ্যমগ্রামের ফ্লাইওভারের কাছে তৃণমূল এবং বামেদের মিছিল মুখোমুখি হয়ে যাওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যেই ধ্বস্তাধস্তি, হাতাহাতি, মারামারি হয়। এর ফলে উত্তেজনা দেখা দিলে দ্রুত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। সরিয়ে দেওয়া হয় দুই পক্ষের নেতা কর্মীদের। প্রকাশ রাহা বলেন, বনধ উপেক্ষা করেই ব্যাবসায়ীরা দোকান খুলেছিলেন। কিন্তু বনধ সমর্থনকারীরা জোর করে স্থানীয় দোকান গুলি বন্ধ করে দিচ্ছিলেন। এর পাশাপাশি সকালের দিকে ফ্লাইওভার দিয়ে বেশ কয়েকটি ট্রাকের চাকার হাওয়া খুলে দিচ্ছিল বনধ সমর্থনকারীরা। এই নিয়েই বচসা থেকে ধ্বস্তাধস্তি হয়েছিল।
বনধ সমর্থনকারীরা এদিন শিয়ালদহ বনগাঁ শাখার হাবরা, অশোকনগর, গোবরডাঙ্গা এবং মছলন্দপুরে রেল অবরোধ করেন। অশোকনগরে দুই দফায় রেলের ওভারহেডের তারে কলাপাতা ফেলে অবরোধ শুরু করেন।হাবরা, মছলন্দপুর এবং গোবরডাঙ্গাতে রেলগেট অবরোধের ফলে একই সাথে রেল এবং যশোহর রোড অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। দফায় দফায় প্রায় আধ ঘন্টা অবরোধের ফলে এই শাখায় রেল চলাচল বিঘ্ন ঘটে। রেল অবরোধ হয়েছে শিয়ালদহ মেইন শাখার কাচরাপাড়া, কাকিনাড়া, শ্যামনগর, আগরপাড়া এবং খরদহ স্টেশনে। রেলগেটে দাঁড়িয়ে অবরোধে সামিল ছিলেন বনধ সমর্থনকারীরা।
ফরওয়ার্ড ব্লকের জেলা সম্পাদক সঞ্জীব চ্যাটার্জি জানান, এদিনের বনধ জেলা জুড়ে শান্তিপূর্ণ ভাবে এবং সাধারনের স্বতঃস্ফূর্ততায় হয়েছে। তিনি বলেন, 'আমরা কোথাও জোর করে অটো এবং বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দিই নি। আমরা বাসের যাত্রীদের কাছে বনধের সমর্থনে হাত জোড় করে নেমে আসতে বলেছিলাম।গাড়ির চাকার হাওয়া খুলে দেওয়ার ঘটনার সাথে দলের কর্মীদের কোন যোগ নেই।' বামেদের ডাকা বনধ প্রসঙ্গে তৃণমূলের জেলা সভাপতি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেন, বনধ কিচ্ছু হয় নি। রাজ্যের মানুষ অনেক বছর থেকেই বনধ প্রত্যাহার করেছে। জেলা জুড়ে জন জীবন সচল ছিল। বনধ কার্যকরী না হওয়ায় বামেদের গ্রহনযোগ্যতা একেবারে শুন্য হয়ে গেল।

No comments:
Post a Comment