আজ আমরা স্বাধীন, কিন্তু এই স্বাধীনতা এক দিনে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে রক্তাক্ত ইতিহাস। সেই কথা আজও আমাদের শরীরে শিহরণ জাগায়। কত মানুষের রক্ত ঝরেছে, প্রান বিসর্জন দিয়ে তবেই এসেছে স্বাধীনতা। যাঁরা প্রান দিয়েছিলেন দেশের জন্য, তাঁদের মধ্যে একজন হলেন ক্ষুদিরাম বসু। হাসি মুখে দেশের মুক্তির জন্য ফাঁসির দড়িতে ঝুলেছিলেন। তাঁর এই বলিদানের কথায় আজও সিক্ত হয় আমাদের চোখের পাতা।
এমনকি তাঁর জন্মদিনের মত এমন সুখের দিনেও ঘুরে ফিরে আসে তাঁর মৃত্যু কাহিনী। ফাঁসির মঞ্চে যথারীতি এক কথায় জহ্লাদকেও অবাক করে দিয়েছিলেন আঠেরোর বালক। তাঁর মৃত্যুবরণ দেখে হয়তো ভয় পেয়েছিলেন স্বয়ং যমরাজও। এমনই ছিলেন মেদিনীপুরের বিষ্ময় বালক ক্ষুদিরাম বসু।
জহ্লাদকে কি এমন কথা বলেছিলেন ক্ষুদিরাম বসু? তাঁর ফাঁসির আগের মুহূর্তগুলিও অবাক করে দেওয়া। কথোপকথন এবং আচার ব্যবহারে একবারও মনে হয়নি ওঁকে মৃত্যু ভয় কোনও কথা রয়েছে। সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তী ছিলেন ক্ষুদিরামের পক্ষে সওয়ালকারী তিন আইনজীবীর একজন।
এদিক সেদিক বহু কথার পর তিনি ক্ষুদিরামকে জিজ্ঞাসা করেন “তুমি কি জান রংপুর হইতে আমরা কয়েকজন উকিল তোমাকে বাঁচাইতে আসিয়াছি? তুমি তো নিজেই আপন কৃতকর্ম স্বীকার করিয়াছ।” ক্ষুদিরামের উত্তর ছিল “কেন স্বীকার করব না ?”। এমনই ছিল তাঁর শেষ প্রশ্নটিও।
১১ আগস্ট, জেলের ভিতরে ডানদিকে একটু দূরে প্রায় ১৫ ফুট উঁচুতে ফাঁসির মঞ্চ। দুই দিকে দুই খুঁটি আর একটি মোটা লোহার রড যা আড়াআড়িভাবে যুক্ত তারই মাঝখানে বাঁধা মোটা একগাছি দড়ি ঝুলিয়া আছে। তাহার শেষ প্রান্তে একটি ফাঁস। এরপরেই ক্ষুদিরামকে নিয়ে আসে চারজন পুলিশ।
তথ্য বলছে, ক্ষুদিরামই হাঁটছিলেন আগে। যেন তিনিই সেপাইদের টেনে আনছেন। এরপর সে উপস্থিত আইনজীবীদের দিকে তাকিয়ে হাসে। এরপর ফাঁসির মঞ্চে উপস্থিত হলে তার হাত দু’টি পিছন দিকে এনে বেঁধে দেওয়া হয়। জহ্লাদ তখন শেষ মুহূর্তের কাজ করছিল। গলায় ফাঁসির দড়ি পড়ানো মাত্রই দামাল ছেলের প্রশ্ন “ফাঁসির দড়িতে মোম দেওয়া হয় কেন?” – এটাই তার শেষ কথা। চমকে দিয়েছিল জহ্লাদকে।
এরপরের ঘটনা ইতিহাস। একটি সবুজ রঙের পাতলা টুপি দিয়ে গলা পর্যন্ত ঢেকে গলায় ফাঁস দেওয়া হয়। ক্ষুদিরাম সোজা হয়ে দাঁড়িইয়ে ছিলেন। যেন শেষ মুহূর্তটিকে তিনি প্রাণভরে উপভোগ করছেন। এরপর উডম্যান সাহেব ঘড়ি দেখে একটি রুমাল উড়িয়ে দেন। জহ্লাদ মঞ্চের অন্য প্রান্তে হ্যান্ডেল টেনে দেয়।
কেবল কয়েক সেকেন্ড ধরে উপরের দড়িটি নড়তে থাকে। তারপর সব স্থির। আধঘন্টা পর দুজন বাঙালি ডাক্তার এসে খাটিয়া ও নতুন বস্ত্র নিয়ে যায়। নিয়ম অনুসারে ফাঁসির পর গ্রীবার পশ্চাদদিক অস্ত্রপচার করে দেখা হয়, পড়বার পর মৃত্যু হয়েছে কিনা। ডাক্তার সেই অস্ত্রপচার করা স্থান সেলাই করে, ঠেলে বাইরে চলে আসা জিভও চোখ যথাস্থানে বসিয়ে দেন। পরিয়ে দেন নতুন কাপড়। এরপর দেহ আসে জেলের বাইরে।
অন্তিম সময়ে ক্ষুদিরাম ম্যাৎসিনী, গ্যারিবল্ডি ও রবীন্দ্ররচনাবলী পড়তে চেয়েছিলেন। অন্তিম দিনে আইনজীবী কালিদাসবাবুকে বলেছিলেন , “রাজপুত নারীরা যেমন নির্ভয়ে আগুনে ঝাঁপ দিয়া জওহরব্রত উদযাপন করত , আমিও তেমন নির্ভয়ে প্রাণ দিব।” ১০ আগস্ট সে বলেছিল, “আগামীকাল আমি ফাঁসির আগে চতুর্ভুজার প্রসাদ খাইয়া বধ্যভূমিতে যাইতে চাই”ফাঁসির আগে ক্ষুদিরামের শেষ ইচ্ছা প্রথমে ছিল এই যে – তিনি বোমা বানাতে পারেন, অনুমতি পেলে ওটা সবাইকে শিখিয়ে যেতে চান!
(সংগৃহীত)
No comments:
Post a Comment