বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মানুষের জন্য নীরব আতঙ্কে পরিণত হয়েছে প্লাস্টিক। প্লাস্টিক পরিবেশের ক্ষতি করার পাশাপাশি মানুষেরও ব্যাপক ক্ষতি করছে। এমনকি আমরা প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৫ গ্রামের মত প্লাস্টিক হজম করছি বলে নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে। এই পরিমাণ প্লাস্টিক একটি ক্রেডিট কার্ডের সমান। সুতরাং বলা যেতে পারে, আমরা প্রতি সপ্তাহে এক ক্রেডিট কার্ডের সমপরিমাণ প্লাস্টিক গলাধঃকরণ করছি।
সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড (ডাব্লিউডাব্লিউএফ) এর অনুমোদনে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউক্যাসল প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিক নিয়ে একটি গবেষণা করে। সেই গবেষণা থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে। প্লাস্টিকের এই দূষণ মূলতঃ মাইক্রোপ্লাস্টিকের (প্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্র অংশ) ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে হয়ে থাকে। এটি ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ক্ষুদ্র হয়ে থাকে।
আমরা আমাদের খাবার এবং জলের মাধ্যমে এই প্লাস্টিক গ্রহণ করে থাকি। এমনকি বাতাস থেকেও প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা আমাদের শরীরে প্রবেশ করে।
নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির এই গবেষণায় বলা হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে মানুষ প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ২০০০ মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা গ্রহণ করে থাকে।
প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র এই কণা বিভিন্ন উৎস থেকে আমাদের কাছে আসে। যেমন কাপড়ের কৃত্রিম তন্তু, কিছু টুথপেস্টে ব্যবহৃত মাইক্রোবিডস (এক মিলিমিটারের কম কঠিন প্লাস্টিক কণা দিয়ে তৈরি) অথবা প্লাস্টিকের বড় টুকরা থেকে, যা ফেলে দেওয়ার সময় ছোট ছোট টুকরায় পরিণত করা হয়।
এছাড়া বর্তমানে প্রায় সময় নদী এবং সমুদ্রের জলে পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বর্জ্য ভাসমান অবস্থায় দেখা যায়। মাছ এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী এসব প্লাস্টিক খেয়ে থাকে। আমরা সেসব মাছ খেয়ে থাকি। এভাবে খাদ্য চেইনের মাধ্যমেও প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা মানব শরীরে প্রবেশ করে থাকে।
এই গবেষণায় অংশ নেওয়া গবেষক কালা সেনাথিরাজা মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে জানান, আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য এবং পানীয়তেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের দেখা পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে জল, বিয়ার, শেলফিশ এবং লবণের কথা বলা যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এটা সুস্পষ্ট যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের এই সমস্যা একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এমনকি কোন কোন দেশ যদি এই প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কারও করে, এর মানে এটা নয় যে তারা নিরাপদ। কারণ মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা অন্যান্য উৎস থেকেও প্রবেশ করতে পারে।’
গবেষণায় দেখা গেছে, খাওয়ার জলের মাধ্যমে আমরা প্লাস্টিকের বড় একটি অংশ গ্রহণ করে থাকি। খাওয়ার জলের মাধ্যমে প্রতি সপ্তাহে একজন ব্যক্তি কমপক্ষে ১ হাজার ৭৬৯টি প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা গ্রহণ করে থাকে। এক্ষেত্রে বোতল কিংবা কলের মাধ্যমে প্লাস্টিক গ্রহণ করা হয়। তবে এক্ষেত্রে অঞ্চলভেদে প্লাস্টিকের পরিমাণ গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু হেরফের হতে পারে।
২০১৮ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপীয় কিংবা ইন্দোনেশিয়ার কলের জলের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের কলের জল থেকে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা পাওয়া গেছে।
মানুষের প্লাস্টিক গ্রহণের দ্বিতীয় বড় উৎস শেলফিশ। এই জাতীয় খাদ্যের মাধ্যমে প্রতি সপ্তাহে মানুষ কমপক্ষে ১৮২ টি প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা গ্রহণ করে থাকে, যা ০.৫ গ্রামের সমপরিমাণ।
গবেষণায় বলা হয়, শেলফিশের পুরোটাই মানুষ খেয়ে থাকে। প্লাস্টিকের দূষণে বিপর্যস্ত সমুদ্রে এদের বসবাস। ফলে এদের মাধ্যমে মানুষও প্লাস্টিক গ্রহণ করে থাকে।
এছাড়া শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাও আমরা গ্রহণ করে থাকি।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর ৩৩০ মিলিয়ন মেট্রিক টন প্লাস্টিক উৎপাদিত হয়। ২০৫০ সালে বৈশ্বিক প্লাস্টিকের এই উৎপাদন আরও তিনগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্লাস্টিকের এই ব্যবহার পরিবেশের পাশাপাশি মানব স্বাস্থ্যের জন্য ব্যাপক ক্ষতিকর বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
(সংগৃহীত)

No comments:
Post a Comment