দেবশ্রী মজুমদারঃ বারামূল্লা সি এর পি এফ ক্যাম্প ট্যু শ্রীনগর ক্যাম্প। আপাততঃ মুরারইয়ের নয়াগ্রামের ৯জন শ্রমিকের অস্থায়ী ঠিকানা। বাড়ি ফেরার তাগাদা প্রত্যেকের! কিন্তু কিছু পদ্ধতিগত কারণে বিলম্ব। এদিকে এই নয় জনের বাড়িতে চিন্তার পাহাড় ভেঙে পড়েছে! যতক্ষণ না বাড়ি ফিরছে ততক্ষণ স্বস্তি নেই! অতিরিক্ত অর্থ আয়ের জন্য ঝুঁকির পথ বাংলার শ্রমিকদের? এইজন্যই কী পাঁচ নিরীহের প্রাণ চলে গেল?
এই ঘটনার পর নড়ে চড়ে বসেছে স্থানীয় পঞ্চায়েত। মিত্রপুর পঞ্চায়েতের প্রধান মর্জিনা বিবির স্বামী বাসারুজ্জামান মোল্লা বলেন, স্থানীয় ওই পরিবারের সদস্যদের ডেকে আমি খোঁজ নিই, কেন তাঁদের বাড়ির লোক ভিন রাজ্যে কাজ করতে যান। তাতে যেটুকু বুঝলাম অতিরিক্ত অর্থের জন্য তাঁরাই বাইরে যান। আরেকটা কারণ, একশো দিনের কাজ এখানে সীমিত। কেউ ভাগচাষ করতে চায় না। কারণ তাদের ধান কিষান মাণ্ডিতে বিক্রি করতে গেলে জমির পরচা ইত্যাদি নথি নেই। যা আছে মালিকের। অর্থাৎ তা দেখালে মালিকে ব্যংক একাউন্টে জমা হবে। এই ঝামেলায় কেউ যেতে চায় না। তাছাড়াও জন সংখ্যা বেশী, জমি কম। আর একশো দিনের সরকারি কাজ দেওয়ার জন্য খাস জমি এলাকায় নেই। ব্যক্তিগত পুকুরে মাটি কাটা যাবে না। সেটা করলেও, বন সৃজন প্রকল্পে ক’দিনের কাজ হবে? এলাকায় মজুরিও সেরকম নেই।
এলাকার বাসিন্দা, মিরাজ হোসেন বলেন, এলাকায় রাজমিস্ত্রীর মজুর সাড়ে চারশো টাকা ও যোগানদারের মজুরি তিনশো টাকা। কত কাজ আছে? একই কথা বলেন মিত্রপুরের বাসিন্দা কুতুবউদ্দিন সেখ। তিনি বলেন, চেন্নাই, কেরালা বা অন্য ভিন রাজ্যে রাজমিস্ত্রির দৈনিক মজুরি হাজার, যোগানদারের পাঁচশ টাকা। এছাড়াও আছে ওভার টাইম। মাসে এক একজন পঞ্চাশ হাজার আয় করেন। চার মাস অন্তর বাড়ি ফেরেন দুই লক্ষাধিক টাকা নিয়ে। কেউ কেউ ফ্লাইটে আসেন টাকা ছিনতাইয়ের ভয়ে। মিত্রপুরে কাঁচা বাড়ি পাবেন না। অনেক স্নাতক এই কাজ করছেন। আগে দালালের মাধ্যমে যেতেন। এখন নিজেরাই যোগাযোগ করে বাইরে যান। এলাকায় শিক্ষিতের হার ষাঠ শতাংশের বেশি। বাংলায় সাম্মানিক পাইকার পর্যন্ত আছে। সবাই খেটে খায়।
এব্যাপারে মিত্রপুরের বাসিন্দা বর্তমানে কেরালায় রাজমিস্ত্রি হিসেবে কর্মরত বাহাল সেখকে ফোন করলে জানা যায়, কেরালায় হেড মিস্ত্রির দৈনিক মজুরি হাজার টাকা। কাজ কামাই থাকে না। যোগানদারের দৈনিক মজুরি পাঁচশো টাকা। চেন্নাইয়ে আরও বেশি। তেরোশো মত। মুম্বাইয়ে কর্মরত রাজমিস্ত্রি রোহিত খান বলেন, হাজার টাকা মজুরি ঠিকই কিন্তু থাকার জন্য দেড়শো টাকা কেটে নেয়।
ভিন রাজ্যে বাংলার শ্রমিকদের পাড়ি দেওয়ার ব্যাপারে বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চের সভাপতি সামিরুল সেখ বলেন, পেটের দায়েই তাদের জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। আমাদের সংগঠন অতীতে বহুবার বাংলার বাইরে থেকে বাংলার শ্রমীকদের উদ্ধার করতে গিয়ে এই তথ্য জানতে পেরেছে শ্রমিকদের কাছ থেকে।
এলাকাসূত্রে জানা গেল, কৃষিতেও পিছিয়ে পড়া এলাকা এই মুরারই-২ ব্লক। বছরে একাবার অর্থাৎ আমন ধান হয়। জন সংখ্যার নিরিখে হাতে কাজ নেই। এলাকায় কাজ থাকলে, আয় বেশি হলে কেউ বাইরে যেত না। এব্যাপারে জেলা পরিষদের সভাধিপতি বিকাশ রায় চৌধূরী বলেন, আমি মানি না, এলাকায় কর্ম সংস্থান নেই বলে, মুরারইয়ের লোক বাইরে কাজ করতে যায়। বেশি আয় করার জন্য বাইরে যায়। কেন্দ্র সরকারের বৈমাতৃসুলভ আচরণ সত্ত্বেও আমাদের মুখ্যমন্ত্রী একশো দিনের কাজ সহ বিভিন্ন কর্মসংস্থান নিযুক্তি প্রকল্প চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, পশ্চিম বঙ্গের বাইরে বীরভূমের কত মানুষ কাজ করতে যাচ্ছে, তার কী কোন সরকারি হিসেব রাখার ব্যবস্থা আছে? উত্তরে তিনি বলেন, কেউ না বললে এটা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে সরকারি নির্দেশ এলে সেটা আমরা রাখব।
পি/ব
No comments:
Post a Comment