প্রেসকার্ড নিউজ ডেস্ক ; রক্তে ভেসে যাচ্ছে সালমার বাঁ পায়ের গোড়ালী। তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। অন্ধকারের মধ্যেই কোনওরকমে হাতের রুমালটা দিয়ে গোড়ালীটাকে বেঁধে নিলো সালমা। বিড় বিড় করে তীব্র আক্রোশে খিস্তি মেরে বললো, খানকির বাচ্চাগুলো আর সময় পেলো না। রুমাল দিয়ে চেপেও বন্ধ করা যাচ্ছে না রক্ত। অন্ধকারের মধ্যে ভালোই বুঝতে পারছে, অনেকটাই চিরে গিয়েছে কাঁটাতারে। আর একটু হলেই বিএসএফের হাতে ধরা পড়ে যেতো। ভাগ্যিস বরাত জোরে বেঁচে গেছে। এযাত্রা কাঁটাতারের নীচে পড়ে থাকা লম্বা ঘাস বনে শুয়ে নজর এড়িয়েছে বিএসএফের। না হলে এতোক্ষণে বানচোতগুলো ঠিক রুল ঢুকিয়ে দিতো...
বাঁশবনের অন্ধকারে বাঁ পায়ের গোড়ালীটাকে চেপে ধরে কোনওমতে বসে পড়লো সালমা। রক্ত বেরোনো না কমলে হাঁটা ঠিক হবে না। চারিদিক জুড়ে অখন্ড নিঃস্তব্ধতা। বাঁশবনের ওপারে কাঁটাতারের বেড়ার ধার দিয়ে ঘন ঘন পায়চারী করছে বিএসএফের দল। নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যে থেকে থেকে দূরের বিএসএফের উঁচু টাওয়ার থেকে সার্চ লাইটের আলো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে গোটা সীমান্তবর্তী এলাকাকে। প্রায় আধঘন্টার গোড়ালীটাকে চেপে ধরে বসে রইলো সালমা। রক্ত বের হওয়া কমলে বের হয়ে পড়লো সে। গ্রামের গলি ঘুঁজি রাস্তা তার হাতের তালুর মতো চেনা। সালমা জানে কোন পথ দিয়ে কোথায় গিয়ে ওঠা যায়। নিস্তব্ধ পায়ে সেই সমস্ত রাস্তা ধরে এগিয়ে চললো সে।
বারবার মোবাইলে চেষ্টা করেও লাইন লাগাতে পারলো না ছায়ামূর্তিটি। মনে মনে বিরিক্ত হয়ে বিড়বিড় করে গেলো, শালা মাগী ফোনে ফোনে সুইচ স্টপ করে রেখেছে কি জন্যে কে জানে? চূড়ান্ত বিরক্তি প্রকাশ করে একটা বিড়ি ধরালো। ফুক ফুক করে বিড়িতে টান দিতে লাগলো সমানে। মাথার ভিতর একদঙ্গল চিন্তা সমানে কিলবিল করছে। সামনেই কোরবানি ঈদ। এই সময় ঠিকঠাক যদি বাংলাদেশে মাল পাঠিয়ে দেওয়া না যায় তাহলে মোটা টাকার লোকসান ঘটে যাবে। ঈদের আগেই অন্তত চারটে ট্রিপ পাঠাতেই হবে বাংলাদেশ। যেভাবেই হোক কালকের মধ্যে ৫০ টির মতো মালগুলো ঢোকাতেই হবে ওপারে। ফের মোবাইলে বোতাম টিপলো সে।কিন্ত খানিকক্ষন কুই কুই করে আবারও লাইনটা কেটে গেলো। বুঝে উঠতে পারছে না ছায়ামূর্তি।
কখনও তো এতোক্ষন ধরে মোবাইল বন্ধ থাকে না। তাহলে কি কোনও বিপদ ঘটে গিয়েছে! মেরুদন্ড দিয়ে শীতল একটা স্রোত খেলে গেলো সারা শরীরে। ফের নিজের মনে বিড়বিড় করে উঠলো, মাগীদের দিয়ে কাজ করানোই শালা ঝামেলার। কি বিপদ ঘটতে পারে কিছুতেই ঠাওর করে পারছে না ছায়ামূর্তি। কখনও তো এতোক্ষন ধরে মোবাইল বন্ধ থাকে না। তাহলে কি কোনও বড়োসড়ো বিপদ ঘটে গেলো!!! বিড়িতে শেষ টানটা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলেই ফের নতুন আর একটা বিড়ি বের করলো পকেট থেকে। হঠাত যেন মন্দিরের উপরে ওঠার সিঁড়িতে কারো পায়ের শব্দ। মুহূর্তে সাবধান হয়ে উঠলো ছায়ামূর্তি। কোলের পাশে রাখা বিদেশী মডেলের রিভলবারটাকে সাঁ করে তুলে নিলো ডানহাতে। নাহ, আবার শুনশান। আর কোনও আওয়াজ কানে এলো না।
দোল মন্ডব থেকে বেশ খানিকটা দূরে রয়েছে পুরনো জমিদারদের পোড়ো নাট মন্দির। জঙ্গলে ভরা চারিদিক। বিষধর সাপ, শেয়াল থেকে খট্টাসের বাস সেখানে। দিনের বেলাতেও সে মুখো ভুলেও পা বাড়ায়না গ্রামবাসীরা। আচমকা সেই নাট মন্দিরের ভেতর থেকে ভসে এলো নাকি সুরে কান্নার আওয়াজ। যে আওয়াজকে গ্রামবাসীরা পেত্নীর আওয়াজ বলেই চেনে। নাকি সুরে বীভতস সেই কান্নার আওয়াজ। শুনলেই যেন সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। সপ্তাহের শনি মঙ্গলবার করে নাটমন্দির থেকে থেকে পেত্নীর এই কান্না শোনা যায়। গ্রামের লোকে বলে অপঘাতে মারা যাওয়া মহিলাদের আত্মাই নাকি প্রতি শনি মঙ্গলবার রাতে এই রকম অতৃপ্ত আর্তনাদ করে।
দোল মন্ডবের উপরে বসে পেত্নীর ওই ভয়াবহ নাকি সুরে কান্নার আওয়াজ শুনলো ছায়ামূর্তি। একটুও ভয় পেলো না সে। উলটে খানিকটা হলেও স্বাস্তির শ্বাস ফেললো সে। মোবাইল ফোনটাকে এবারে সুইচ স্টপ করে সোজা প্যান্টের পকেটে চালান করে দিলো সে।
রাত ক্রমশ গভীর হচ্ছে। আকাশে মেঘের উপর মেঘ জমেছে। রাত যতো বাড়ছে। ঠান্ডার দাপটটাও ততোই চড়ছে। শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে পার হয়ে যাচ্ছে সময়। পাশের পুরনো নাট মন্দির থেকে পেত্নীর কান্নার আওয়াজটা থেমে গিয়েছে বেশ কিছুক্ষণ। চারিদিকে ভীষন রকম চুপচাপ।গাছ থেকে শুকনো পাতা পড়ার শব্দটি কাণে এশে লাগোছে। চূপচাপ দোল মন্ডপের উপর চাদর মুড়ি দিয়ে বসে কারো অপেক্ষায় প্রহর গুনে চলেছে ছায়ামূর্তি। এবার ফের সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। কিন্ত এবার আর চমকে উঠলো না ছায়ামূর্তি। ও জানে কে আসছে।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ছায়ামূর্তির সামনে এসে দাঁড়ালো সালমা। হাতের ব্যাগটাকে ধপাস করে ফেলে বসে পড়লো। ছায়ামূর্তি ফের পকেট থেকে মোবাইল বের করে সুইচ অন করে নিলো। তারপর মোবাইলের টর্চ লাইট জ্বেলে সালমার শরীরের উপর ফেলতেই চমকে উঠলো।
-একি রক্ত কেন? কাকে দিয়ে মারিয়ে এলি?
অন্যদিন হলে রেগে যেতো সালমা। কিন্ত আজ একফোঁটাও না রেগে উলটে গলা অনেকটাই নামিয়ে বললো, তোমার রাজত্বে কার এতো সাধ্যি আছে বড়োভাই?
মোবাইলের টর্চটাকে বন্ধ করে ছায়ামূর্তি এবার রীতিমতো গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো, মোবাইল বন্ধ রেখেছিলি কেন?
বিপদ ঘটেছে কোনও?
বড়োভাইয়ের প্রশ্নে বেশ খানিকটা সময় চুপচাপ থাকলো সালমা। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, বিপদের সঙ্গে বসবাস যখন বিপদ তো আসবেই। তা নিয়ে ভাবলে চলবে? বলেই হেসে উঠলো।
-মাগী দাঁত কেলাস না, কি হয়েছে বল?
আবার হেসে ফেললো সালমা। তারপর খানিকটা সময় থেমে বললো, তেমন কিছু না গো। কাঁটাতার পার হতে গিয়ে খানকির বাচ্চাগুলোর হাতে ধরা পড়ে যাচ্ছিলাম। গা ঢাকা দিতে গিয়ে গোড়ালীর ছাল কেলিয়ে গিয়েছে।
চুপচাপ হয়ে গেলো বড়োভাই। যেন দুঃশ্চিন্তার পাহাড় নামলো বুক থেকে। তবে ঠোঁটের ইপত বিড় বিড় করে বারবার বলতে লাগলো, ...এবার মালগুলো কেন এতো জ্বালাচ্ছে?
(চলবে)
পি/ব
No comments:
Post a Comment