লিখছেন শঙ্খচিল
গায়ে খদ্দরের চাদর জড়িয়ে গ্রামের শেষ মাথায় রতনের চায়ের গুমটিতে অনেকক্ষন ধরে বসে ছিলো মানুষটা। চুপচাপ একের পর এক চায়ের গ্লাস শেষ করে চলেছে। কৌতুহলী অনেকেই গায়ে পড়ে নানা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে তার দিকে। গ্রামে কোথায় এসে উঠেছে সে জানতে চেয়েছে অনেকেই। কিন্ত প্রতি ক্ষেত্রেই ঠোঁটে ঝুলানো একফালি মিষ্টি হাসির রেখা গালের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত অবধি টেনে হ্যাঁ অথবা না শব্দেই উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছে লোকটা।
অদ্ভূতভাবে গ্রামে কার বাড়িতে সে এসেছে সেটা একরকম গোপন করেই শুধু বললো, আত্মীয়র বাড়িতে এসেছি। আর বড়ো কোনও শব্দই ব্যাবহার করেনি সে। সব কথার উত্তরেই মুচকি হেসেই জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছে সে। এই গ্রামে আজই প্রথম দেখা গেলো লোকটাকে। কে, কী তার পরিচয় কেউ কিছুই জানে না।
শেষ বিকেলের সূর্যটা গ্রামের দূরে সোনালি ধানে মোড়া বিস্তীর্ণ বিল পেরিয়ে উঁচু মেঠো পথের আড়ালে ডুব দিতেই চা দোকান ছাড়লো লোকটা। পকেট থেকে একটা ১০০ টাকার নোট রতনের হাতে দিয়ে বললো, এটা রাখো, পরে যখন আবার চা খাবো, তখন কেটে নিও। এরপর আস্তে আস্তে সে মেঠো পথ বেয়ে ঢুকে গেলো গ্রামের ভিতরে। অন্ধকার তখন ধীরে ধীরে জাঁকিয়ে বসতে আরম্ভ করেছে চারপাশে।
হেমন্তের ঠান্ডা বাতাস শরীরে শিরশিরানি জাগিয়ে যাচ্ছে। দোকানের ল্যাম্পটা জ্বালতে জ্বালতে রতন দোকানের একপাশে বাঁশের চাতালে বসা সুবিমল কাকাকে জিজ্ঞেস করলো, লোকটাকে চেনো? পৌড় সুবিমল অনেকটা নির্লিপ্তভাবেই উত্তর দিলেন, পুলিশ-পালাশের খোচর হবে মনে হচ্ছে। সাবধানে থাকিস। গ্রামের কথা যেন কিছু বলে ফেলিস না।
ল্যাম্পটাকে জ্বেলে দোকানের সামনে বিস্কুটের বয়ামের উপর রাখতে রাখতে রতন বললো, পুলিশ ঢুকলে তো ভালোই। যা চলছে গ্রামে। সাপলুডোর মতো রাস্যাগুলো এঁকে বেঁকে কাটাকুটি খেলে গ্রামের পেটচিরে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে গিয়ে মিশেছে। ওধারে গ্রামের সীমানা শেষ হতেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া। এপারে বিএসএফ আর ওপারে বিজিবি। অথচ দুই পারের সীমান্তরক্ষীদের চোখে ধুলো দিয়ে এখানে রাতদিন সর্বক্ষনই চলছে চোরাকারবারীদের চোর-পুলিশ খেলা।
প্রতিদিনই অপরিচিত মুখের ভিড় সীমান্ত লাগোয়া এই গ্রামে লেগেই থাকে। কে কোত্থকে আসছে, কোথায় যাচ্ছে, তার হিসেব রাখে না কেউ। খদ্দরের চাদরটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে হনহন করে গ্রামের রাস্তা ধরে সোজা হাঁটতে লাগলো মানুষটা। চারপাশে অন্ধকারটা বেশ জমাট বেঁধে গিয়েছে ইতিমধ্যে। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া থেকে থেকেই যেন হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ ধরে একসময় হাঁটতে হাঁটতে সবার অলক্ষ্যে চলে গেলো মানুষটা। পুরো মালটা বুঝে নিয়েছিস তো? কাল ভোরে মাল ঢুকলেই সোজা পোঁদে... কথা শেষ করার আগেই বিড়ি মুখো ছায়ামূর্তিগুলো খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠলো।
একজন বলে উঠলো, বাকিটা আর বলতে হবে না বড়োভাই। অন্ধকারের মধ্যে খস খস শব্দে একের পর এক নোট গুনে ফেললো একটা ছায়ামূর্তি। তারপর নোটগুলোকে একটা বান্ডিল করে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গোটা তিনেক ছায়ামূর্তির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, পাক্কা পঁচাত্তর আছে। হাজার টাকার নোট। ঠিকঠাক মালগুলো ঢুকিয়ে দিস। এরপরেই তিনটে ছায়ামূর্তি পুরনো দোল মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো। তারপর অন্ধকারের মধ্যেই হারিয়ে গেলো। গ্রামের সীমান্তের ধারে দীর্ঘদিন ধরে অযত্নে অবহেলায় পড়ে রয়েছে এই দোল মন্দিরটা। চারদিকে বড়ো বড়ো জঙ্গলে ঘিরে নিয়েছে জায়গাটা। গ্রামের মানুষ ভুতুড়ে দোল মঞ্চ বলেই চেনে মন্দিরটিকে।
রাত বেরাতে নেহাত প্রাণের দায় না হলে কেউ এই রাস্তামুখো হয়না। শোনা যায়, অমাবস্যা মেনে মাঝ রাতে এই দোল মন্ডপের উপর নাকি দেখা যায় তেনাদের। অমাবস্যার রাতে রীতিমতো অশিরীদের নরক গুলজার চলে এই তল্লাটে। এছাড়াও নাকি গভীর রাতে এই দোল মন্ডবের উপর অতিকায় সব প্রেতাত্মারা ঘুরে বেড়ায়। গভীর রাতে পেত্নীর কান্না শোনা যায়। এই তো কয়েকমাস আগে এই দোল মন্ডপের সামনের মাঠে এক বাংলাদেশী যুবতীর ক্ষত বিক্ষত দেহ পড়ে থাকতে দেখেছিলো গ্রামের মানুষ।
ফলে রাতে এই দোল মন্ডপের নামও মুখে আনতে চায় না গ্রামবাসী। ছায়ামূর্তিগুলো নেমে যাওয়ার পর যে ছায়ামুর্তিটি দোল মন্ডবের উপরে বসে ছিলো সে গায়ের চাদরটা দিয়ে ভালো করে ঢেকে মাথাটাকে মুড়ি দিয়ে নিলো। তারপর পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে চাদরের মধ্যে রেখেই একটা নম্বরে ফোন লাগালো। স্ক্রিণে আলোটা নিভে যাওয়ার পরই মোবাইলটা কানে ধরলো সে। অপেক্ষা করতে লাগলো অপর প্রান্ত থেকে হ্যালো শব্দের অপেক্ষায়। (চলবে)
পি/ব
No comments:
Post a Comment