নিজস্ব প্রতিনিধিঃ কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে হয় কালীপূজা। ঠিক আগের রাত হলো ভূত চতুর্দশী।
ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের ঋষি দীর্ঘতমা হলেন উতথ্য ও মমতার পুত্র। তিনি ছিলেন অন্ধ ও গোবিদ্যায় পারদর্শী। যত্রতত্র সঙ্গম করে বেড়াতেন বলে অন্য ঋষিগণ তাঁকে এড়িয়ে চলতেন। স্ত্রী প্রদ্বেষীর আদেশে দীর্ঘতমা ঋষির পুত্ররা পিতাকে ভেলায় চড়িয়ে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেন। বিখ্যাত রাজা চক্রবর্তী বলি তাঁকে দেখতে পেয়ে প্রাসাদে নিয়ে যান। দীর্ঘতমা ঋষির ঔরসে বলিপত্নী সুদেষ্ণার গর্ভে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র ও সুহ্ম নামের পাঁচ পুত্রের জন্ম হয়। বলি রাজার এই পাঁচ জন পুত্র পূর্ব ভারত শাসন করতেন, তাঁদের নাম অনুযায়ী রাজ্যগুলির এমন নামকরণ।
বলি রাজা স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতালের অধীশ্বর ছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্রও তাঁর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছেন। শিবভক্ত, দানশীল মহারাজ চক্রবর্তী বলি বিষ্ণুর আরাধনা করতেন না। দেবতারা শিবভক্ত বলির পরাক্রমে অস্থির হয়ে বিষ্ণুর শ্মরণাপন্ন হলেন। বিষ্ণু বামন অবতার রূপে বলির কাছে তিন পাদ জমি চাইলেন। সব জেনেও বলি তা দিতে সম্মত হলেন।
বামন অবতার তখন তাঁর এক পা রাখলেন স্বর্গে, অন্য পা মর্ত্যে। উদর থেকে বেরিয়ে এল তৃতীয় পদ। বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদের পৌত্র বলি সেই চরণ মস্তকে ধারণ করলেন। শিবভক্ত বলির স্থান হল রসাতলে, সে এক গূঢ় জগৎ। আর সেই জন্য বিষ্ণুর বরে মহাবলি অমর। তিনি সপ্ত চিরজীবীর অন্যতম। বাকি ছয় জন হলেন ব্যাসদেব, অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য, পরশুরাম, হনুমান ও বিভীষণ।
এই ভূত চতুর্দশীর রাতে শিবভক্ত বলি মর্ত্যে আসেন পূজা নিতে। সঙ্গে আসেন তাঁর অনুচর ভূতরা। এর ঠিক পরের দিন, চন্দ্রের তিথি নিয়ম মেনে, হয় কালীপূজা। সেও আলোর উৎসব, আতসবাজির জলসা। কালীপূজা ও দীপাবলি উৎসবের গূঢ় দিক হল কালী/কালিকার আরাধনা। কৃষিপ্রধান বাংলায় তিনি আদ্যাশক্তি, তিনিই দশমহাবিদ্যা। মুণ্ডমালা তন্ত্র অনুযায়ী, আদ্যাশক্তি হলেন কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধুমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও কমলাকামিনী। কৃষিপ্রধান তন্ত্রে কালী বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আদি কারণ। তিনি শক্তি, তাঁর নাম প্রকৃতি। তিনিই মহৎ জ্ঞান বা বিদ্যা। এই হল পুরাণের কথা। কালীপূজার আগের দিন চৌদ্দ শাক খেতে হয়। সন্ধ্যায় জ্বালতে হয় চৌদ্দ প্রদীপ। রাতে বিদেহী আত্মারা নেমে আসেন মর্ত্যলোকে। পশ্চিমের ‘হ্যালোউইন’ প্রথার সঙ্গে অনেকাংশেই মেলে এই আচার।
চতুর্দশী তিথির ভরা অমাবস্যায় চারিদিক নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। সেই ঘন অন্ধকারে প্রদীপ জ্বাললে বলি রাজার অনুচররা যাতে যত্রতত্র ঢুকে না পড়েন, তার ব্যবস্থা হয় এই ভাবে। ‘হ্যালোউইনে’ও বাড়ির চারপাশে টাঙানো হয় বিচিত্র সব লন্ঠন, অধিকাংশই কুমড়ো কেটে তৈরি চোখ মুখ!
এছাড়াও আছে ১৪টি শাক ভক্ষণের বিধান। নানা রোগ দূর করে এই শাক। পঞ্জিকা মতে যে চৌদ্দটি শাক হলো ওল, কেঁউ, বেতো, সর্ষে, কালকাসুন্দে, নিম, জয়ন্তী, শাঞ্চে, হিলঞ্চ, পলতা, শৌলফ, গুলঞ্চ, ভাঁটপাতা এবং শুষনী।
পি/ব
No comments:
Post a Comment