প্রেস কার্ড নিউজ ডেস্ক ; বাঙালির জন্য বক্রোক্তির অভাব পড়ে নি কোন দিন। সে আজ, কাল কিম্বা পরশু! আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা প্রায় প্রবাদ ব্যবহার করে থাকি। যেমন-- কাউকে তুলনা করার ক্ষেত্রে বক্রোক্তি-- কিসে আর কিসে। তামা আর সিসে! বাঙালীর জন্য আরেক বক্রোক্তি-- বাঙালীরা সব মাথায় ছোট, বহরে বড়। কোন অযোগ্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে বলে থাকি-- কানা ছেলের নাম পদ্ম লোচন। এসব বলে শেষ হবে না। এবার দেখা যাক মণীষীরা কি বলেন:
আজকে নেতাদের নেতাজী বললে খুশি হন, কারণ তাঁদের রসবোধ একেবারেই নেই!
বাংলা সাহিত্যের পাতা থেকে এই রস ভাণ্ডের , কিছু টা উছলে পড়লে চেটে পুটে খেতে মন্দ লাগবে না।
ডি এল রায়ের নন্দ লালকে দেখুন, নেতা দেখার সাধ জন্মের মতো মিটে যাবে:
নন্দর ভাই কলেরায় মরে, দেখিবে তারে কেবা!
সকলে বলিল, 'যাও না নন্দ, করো না ভায়ের সেবা'
নন্দ বলিল, ভায়ের জন্য জীবনটা যদি দিই-
না হয় দিলাম, -কিন্তু অভাগা দেশের হইবে কি?
বাঁচাটা আমার অতি দরকার, ভেবে দেখি চারিদিক'
তখন সকলে বলিল- 'হাঁ হাঁ হাঁ, তা বটে, তা বটে, ঠিক।'
দেশকে জাতিকে জাগিয়ে তুলতে কাজী নজরুল ইসলামের বেশ কয়েকটি কবিতা ছিল বক্রোক্তিতে পরিপূর্ণ:
তার মধ্যে একটি ছিল -- দে গরুর গা ধুইয়ে। ‘প্যাক্ট' ও ‘দে গরুর গা ধুইয়ে'- কবিতায় প্রচুর শ্লেষ ও ব্যঙ্গ্যোক্তির ব্যবহার করেছেন। যেমন ‘প্যাক্ট' কবিতায় লিখলেন- বুকে বুকে মিল হ'ল না কেন, মিল হ'ল পিঠে পিঠে? তাই সই? তিনি তার ‘দে গরুর গা ধুইয়ে' কবিতায় তাই লিখলেন- চর্মকার আর মেথর চাঁড়াল ধর্মঘটের কর্ম-শুরু। পুলিশ শুধু করছে পরখ, কার কতটা চর্ম পুরু। চাটুয্যেরা রাখছে দাড়ি, মিঞারা যান নাপিত বাড়ি।
রবীন্দ্রনাথের বাণী যখন পৃথিবীকে আলোকিত করলেও, স্বদেশের একশ্রেণীর মানুষের আচরণের প্রতিবাদে সূক্ষ্ম ব্যঙ্গোক্তি করেন নজরুল। ‘আনন্দময়ী আগমনে' কবিতায় লিখলেন- ‘রবির শিখা ছড়িয়ে পড়ে দিক হতে আজ দিগন্তরে সে কর শুধু পশিল না মা অন্ধ কারার বন্ধ ঘরে। গগন পথে রবি রথের সাত সারথি হ্যাঁকায় ঘোড়া, মর্ত্যে মানব দানব পিঠে সওয়ার হয়ে মারছে কোঁড়া।' এখানে কিছুটা রবীন্দ্র সমালোচনা দেখা যায়।
নজরুল বলতে চান, ‘রবীন্দ্রনাথ কবি, তার কিরণ- জ্যোতি সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে অথচ তার ঘরের তমসা তাতে দূর হয় না, আকাশে ভ্রাম্যমাণ রবি-রথ, দানবের চাবুকে আহত মাটির মানুষের আর্তনাদ সেখানে পৌঁছায় না, ‘বিষের বাঁশী' কাব্যে বিদ্রোহীর বাণী কবিতায় রবীন্দ্রনাথকে লক্ষ্য করে কবি নজরুল লেখেন- ‘ধর্ম কথা প্রেমের বাণী জানি মহান উচ্চ খুব, কিন্তু সাপের দাঁত না ভেঙ্গে মন্ত্র ঝাড়ে যে বেকুব। কবি লিখেছেন : ‘এই ভারতের মহা মানবের সাগর তীরে' হে ঋষি- তেত্রিশ কোটি বলির ছাগল চরিতেছে দিবানিশি। গোষ্ঠে গোষ্ঠে আত্ম কলহ / অজা যুদ্ধের মেলা, এদের রুধিবে নিত্য রঙিছে ভারত সাগর বেলা / পশুরাজ যবে ঘাড় ভেঙ্গে খায় একটারে ধরে আসি / আরটা তখনো দিব্যি মোটায়ে হতেছে খোদার খাসি। শুনে হাসি পায় ইহাদেরও নাকি আছে গো ধর্ম জাতি / রাম ছাগল আর ব্রহ্ম ছাগল আরেক ছাগল পাতি।
সুকান্তের বক্রোক্তি কম ক্ষুরধার ছিল না। খাদ্য সমস্যার সমাধানে সুকান্ত ভট্টাচার্যের ব্যাঙ্গ:
এই নাও ভাই চালকুমড়ো
আমায় খাতির করো
চালও পেলে
কুমড়ো পেলে লাভটা হল বড়।
সুকান্তের আরেকটি বিখ্যাত বক্রোক্তির উদাহরণ:
‘অবশ্য খাবার খেতে নয়, খাবার হিসেবে'।
তবে কবির পূর্বে কালী প্রসন্ন সিংহ রচনা করেছিলেন ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা'। হুতোমের ব্যঙ্গ ছিল তীক্ষ্ণ। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কমলা কান্তের দপ্তর। তবে বাঙালীর জন্য রবীন্দ্রনাথের বক্রোক্তি কম কিসে!
সাতকোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী/ রেখেছ বাঙালী করে মানুষ করো নি।
পি/ব
No comments:
Post a Comment