দেবশ্রী মজুমদার: একমাস স্কুলছুট ভাদু! গোটা ভাদ্র মাস স্কুলও ছুটি দেয় তাকে! এই ভাদ্রমাসে যা আয় হয়, তাতেই যা আয় হয়, ভাদুর পুজোর জামার পয়সা। আর সংসারের পেট ভরে। ছোট্ট ভাদু স্থানীয় খরবনা উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। বাড়ি বনহাট অঞ্চলের দক্ষিণ শিবপুর। বাবা বাপি বায়েন প্রায় ভূমিহীন চাষি। সম্বৎসর পরের জমিতে খেটে আর মজদুরি করে দিন গুজরান।
ছোট্ট পিঙ্কি কাঁখে আরও ছোট্ট ভাদু নিয়ে কোমর দুলিয়ে গানের তালে তালে নেচে চলেছে। কপালে চন্দনের ফোঁটা। পরনে রঙিন ঘাগরা। গলায় যেন গজ মুক্তোর মালা। আর জামায় সেফটিপিন দিয়ে টাকা আঁটকানো। মুল গায়েন আর দোহারির গানের বোল ছুটছে-“ সারা মাসে জল নাই, ভাদু খাব কি, চল ঢাকা যায়”। এবার জেলায় বৃষ্টির ঘাটতি আছে। তাই ধান কম হবে। গ্রামে গঞ্জে ভাদু নাচ করে আর ধান পাওয়া যাবে না। তাই ভাদুও খুব চিন্তিত!
নাচ থামতেই জিজ্ঞেস করলুম, কিরে শিক্ষক দিবসে স্কুল গিয়েছিলিস? সে জানায়- না। আমি তো ভাদ্রমাস স্কুল যায় না। শিক্ষকরা আমাকে ছুটি দেয়। স্কুল কামাই করে কেন নাচিস? একটু হেসে বলল, নতুন জামা কিনব, সাজার জিনিস কিনবো। পুজো আসে না! জিজ্ঞেস করলুম, স্কুলের বন্ধুদের জন্য মন খারাপ করে না? – মুখ নামিয়ে বললে, করে তো! কাকা স্বপন কুমার বায়েন বলেন, পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পর এই ভাদ্রমাসটা স্কুল কামাই হয়। তারপর যেমন সকলে যায়, সে যায়। বাড়িতে টিউশনি মাস্টার আসেন।
তিনিই সিলেবাসটা একটু টেনে দেন। জিজ্ঞেস করলুম- গোটা দিন এভাবে ঘুরে সন্ধ্যেয় পড়তে পারে? উত্তর এল—খুব পারে। এই একমাস তো! তারপর নিজেই গড়গড়িয়ে বলে চললেন—দেখুন, আমরা অভাবী মানুষ। কোন জমি জায়গা নেই। সরকারি সুবিধা বলতে কিছু পাই না। এখনতো শুনি শিল্পী ভাতা দেয় সরকার। কিন্তু আমরা কিছু পাই না। শুধু পেটের দায়ে বলবো না, আমাদের পারিবারিক পেশা এই ভাদু নাচ দেখানো। ভাদু নাচ গানে আমরা খু আনন্দ পাই। এই মাসে ভাদু পুজো, নাচ গান না হলে আমাদের খুব মন খারাপ করে! আমরা নিজেরাই গান বাঁধি। নিজেরাই সুর দিই। আর কিছু প্রচলিত গান আছে, সেগুলোও গায়।
ভাদ্র মাসের প্রথম দিকে ভাদু পুজো হয়। আবার শেষের দিকে একটা হয়। ছয় জনের একটা দল। সবাই পরিবারের সদস্য। গোটা দিনে যা আয় হয়। তাতে খাবারের খরচ ওঠে না। আনন্দে এই ভাদুগান টিকিয়ে রাখা। মুনিশ মাইনা ওঠে না। সারাদিন মান গান করে এক একজনের ষাট থেকে আশি টাকা আয় হয়। নগদ টাকা আয় হয় শহরে বেশি। গ্রামে পাওয়া যায় চাল। গ্রাম গঞ্জে বেশি আয় হয়। এক জায়গা থেমে, আবার চলে ভাদুর শহর পরিক্রমা। করতাল, ঢোল বাজনদার নিয়ে চলে ভাদু গান। ভাদু ফিরলো দেশে।
দলের সদস্যারা জানায়, পাশের গ্রামে এক শিল্পীর কাছ থেকে মাটির ভাদু মূর্তি বানানো হয়। প্রতি দিন ফুল জল দেওয়া হয়। মন্ত্রতন্ত্র তারা জানে না। যেটুকু হয় ভক্তিতে। ভাদ্র মাসের প্রথম আর সংক্রান্তির দিন অর্থাৎ শেষ দিন ব্রাহ্মণ পুজো করে দেয়। তারপর বহরমপুরের গঙ্গায় ভাসানো হয়। ভাদু চলে গেলে মনে কষ্ট হয়। সারা বছর ভাদু লোক শিল্পীরা অপেক্ষায় থাকেন পরের বছরের জন্য।
ভাদর মাস ব্যাপী নিত্য পুজার পর, তারা গেয়ে ওঠেন ঢোল, কাঁসর আর হারমোনিয়ামের সুরে—আমার ভাদু সোনার যাদু। আবার এসো মোর ঘরে। সকলের দুখের হয় যে বিনাশ । ভাদুর পুজা যেই করে। সত্যি কি তাই! সত্য মিথ্যা জানেন না তাঁরা! তবে ভাদু তাদের মেয়ে। বাপের বাড়ি মেয়ে ছেড়ে গেলে, যেমন কষ্ট হয়, তেমনি কষ্ট হয় তাদের। শত অভাবের মধ্যেও এই পেশা টিকিয়ে রেখেছে তারা!
পি/ব
No comments:
Post a Comment