অপরুপ সুন্দরী পদ্মাবত বা পদ্মিনী ছিলেন উত্তরভারতের হরিয়ানায়ে অবস্থিত সিঙ্ঘলের রাজকন্যা। সিসড়িয়া বংশের রাজা রাওয়াল রতন সিংহ এক সয়ম্বরে জিতে বিবাহ করেছিলেন তাকে। তিনি ছিলেন চিতোড়ের রাজার দ্বিতীয় স্ত্রী। সেই রাজ্যের এক সঙ্গীতকার ছিলেন রাঘব চেতন। তিনি জাদুবিদ্যায়ে খুব পটু ছিলেন। কিন্তু সেই সময়ে জাদু নিষিদ্ধ থাকায়ে তাকে রাজ্য থেকে বহিস্কার করা হয়। তার বদলা নেওয়ার জন্য রাঘব চেতন ব্যাকুল হয়ে পড়েন। তিনি সোজা চলে যান সেই সময়ের দিল্লীর সুলতান আলাউদ্দীন খিলজীর কাছে।
খিলজী খুব শক্তিশালী এবং লোভী শাসক ছিলেন। তিনি তার কাকা জালালউদ্দীনের কাছে বড় হয়েছিলেন এবং তার কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। ১২৯৬ খ্রিস্টাব্দে জালালউদ্দীন তার সাথে দেখা করতে আসলে ছল করে তিনি কাকার হত্যা করেন এবং দিল্লীর সুলতান হয়ে যান। রাঘব চেতন দিল্লীতে গিয়ে একটি জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিলেন যেখানে আলাউদ্দীন শিকারের জন্য প্রায় যেতেন। একদিন সুলতান শিকারে আসলে তিনি বাশি বাজানো শুরু করেন। তার বাশির মধুর আওয়াজে রাজা খুশি হয়ে তাকে ধরে নিজ রাজ্যে নিয়ে আসেন।
তখন রাঘব চেতন বিভিন্ন ছলে সুলতানের কাছে রানী পদ্মাবতীর রূপ ও গুনের বর্ননা দিতে থাকেন। সেই রুপের বর্ননা শুনেই সুলতান পদ্মাবতীর প্রেমে পড়ে যান এবং চিতোড়ের দিকে সৈন্য পরিচালনার আদেশ দেন। রতন সিঙ্ঘের দুর্গ ছিল খুব সুরক্ষিত। তাই আলাউদ্দীন তা দখল করতে ব্যর্থ হন। তিনি রতন সিঙ্ঘের কাছে প্রস্তাব দেন যে রানীকে একবার দেখতে দিলে সৈন্য সমেত চলে যাবেন। একজন রাজপুত নারীর জন্য এই প্রস্তাব ছিল অসম্মানজনক। তাদের প্রথা অনুযায়ী অচেনা ব্যক্তির সাথে দেখা করা নারীদের জন্য বারণ ছিল।
কিন্তু নিশ্চিত যুদ্ধ এড়াতে রতন সিং পদ্মাবতীকে রাজি করান। শর্ত থাকে যে, আলাউদ্দিনকে আয়নায় রানীর প্রতিচ্ছবি দেখতে হবে। মহলের একটি কক্ষে এমনভাবে কিছু আয়না স্থাপন করা হয় যাতে সরাসরি সাক্ষাৎ না করে দূর থেকেই রানী নিজের প্রতিবিম্ব দেখাতে পারেন।নারীর জন্য এই প্রস্তাব ছিল অসম্মানজনক। তাদের প্রথা অনুযায়ী অচেনা ব্যক্তির সাথে দেখা করা নারীদের জন্য বারণ ছিল। কিন্তু নিশ্চিত যুদ্ধ এড়াতে রতন সিং পদ্মাবতীকে রাজি করান। শর্ত থাকে যে, আলাউদ্দিনকে আয়নায় রানীর প্রতিচ্ছবি দেখতে হবে।
মহলের একটি কক্ষে এমনভাবে কিছু আয়না স্থাপন করা হয় যাতে সরাসরি সাক্ষাৎ না করে দূর থেকেই রানী নিজের প্রতিবিম্ব দেখাতে পারেন। এতে সুলতানের লালসা আরও দৃঢ় হয়ে যায়। শিবিরে ফেরার সময় কিছুদূর পর্যন্ত পথ রতন সিং আলাউদ্দিনকে এগিয়ে দিতে আসেন। এই সুযোগের ফায়দা নিয়ে আলাউদ্দিন রতন সিংকে তৎক্ষণাৎ অপহরণ করে ফেলেন। রাজার মুক্তিপণ হিসেবে তিনি দাবী করেন রানী পদ্মাবতীকে। গোরা আর বাদল নামে দুই বীর রাজপুত সেনাপতি তখন আলাউদ্দিন খিলজীকে তার নিজের খেলাতেই হারাবার ফন্দি আঁটেন।
তারা খবর পাঠান, পরদিন সকালে রানী পদ্মাবতী তার দাসী-বাদিসহ পালকিতে খিলজীর শিবিরের দিকে রওনা দেবেন। পরদিন ১৫০, কোনো বর্ণনামতে ২০০ পালকি খিলজীর শিবিরের দিকে রওনা হয়। কিন্তু প্রত্যেকটি পালকি ছদ্মবেশে চারজন করে দুর্ধর্ষ রাজপুত যোদ্ধাদের দ্বারা বাহিত হচ্ছিল আর প্রত্যেক পালকিতে দাসীর বদলে লুকিয়ে ছিল আরও চারজন করে যোদ্ধা। এই প্রতিহিংসাপরায়ণ ভয়ানক সৈন্যদলটি খিলজীর শিবিরে পৌঁছেই অতর্কিত হামলাকরে বসে। আলাউদ্দিন খিলজীর শিবিরে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ করে এই সেনাদল রাজা রতন সিংকে মুক্ত করে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় পরবর্তীতে দ্বিগুণ আক্রোশে আরও বেশি সৈন্য চালনা করে আলাউদ্দিন চিতোরের দুর্গ অবরোধ করেন।
অতি সুরক্ষিত সেই দুর্গে প্রবেশ করতে না পারায় অবরোধই ছিল একমাত্র পথ। দিনের পর দিন অবরুদ্ধ থাকার পর দুর্গের ভেতরে রসদ ফুরিয়ে এলে রাজা রতন সিং সিদ্ধান্ত নেন দুর্গের ফটক খুলে মুখোমুখি হবার। দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ থাকার পর রাজপুতদের জন্য এ যুদ্ধ ছিল অসম যুদ্ধ। পদ্মাবতী ও দুর্গের অন্যান্য নারীরা জানতেন এ যুদ্ধে তাদের পুরুষদের জয়ের সম্ভাবনা কতোটা ক্ষীণ। এরকম পরিস্থিতিতে সম্মান রক্ষায় রাজপুত নারীদের মধ্যে ‘জওহর’ নামক আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহননের এক রকম প্রথার প্রচলন ছিল। বিজয়ী সৈন্যদের হাতে লাঞ্চিত হবার চেয়ে মৃত্যুকেই তারা বেশি সুখকর মনে করলেন।
পি/ব
No comments:
Post a Comment