নজির বিহীন অঘটনের মধ্যে দিয়ে শেল হল জি-৭ সম্মেলন - pcn page old

Post Top Ad

Post Top Ad

Tuesday, 27 August 2019

নজির বিহীন অঘটনের মধ্যে দিয়ে শেল হল জি-৭ সম্মেলন




বিশ্ব বাণিজ্য ও ইরান ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে ফ্রান্সের বিয়ারিতজে শেষ হলো বিশ্ব নেতাদের অংশগ্রহনে আয়োজিত জি-৭ সম্মেলন।  সোমবার তিনদিনব্যাপী সম্মেলনের সমাপ্তিতে এই দুই ইস্যু ছাড়াও বিশ্ব নেতৃবৃন্দের আলোচনায় স্থান পায় ইউক্রেন, লিবিয়া, হংকং, জলবায়ু ও ব্রেক্সিট। বিশ্ব নেতৃবৃন্দের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৈঠকে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ হংকংয়ে সহিংসতা এড়াতে ১৯৮৪ সালের সিনো-ব্রিটিশ ডিক্লারেশনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। খবর সিএনএন ও রয়টার্সের

বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা চান নেতৃবৃন্দ 

 সম্মেলনে যাওয়ার আগে চীনা পণ্যে ফের শুল্ক বাড়িয়ে বাণিজ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে গতকাল সুর নরম করে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি আসছে। বেইজিং চুক্তিতে আগ্রহ দেখানোয় ভাল চুক্তির আশা করা হচ্ছে। কারণ শুল্কে চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং তাদের কর্মসংস্থান হ্রাস পাচ্ছে। এর আগে চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, চীন সমঝোতার মাধ্যমে বাণিজ্য চুক্তি করতে রাজি আছে। বিশ্ব নেতাদের বৈঠকে বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা, মুক্ত বাণিজ্য এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে (ডাব্লিউটিও) কার্যকর করতে এর সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০২০ সালের মধ্যেই এ সংক্রান্ত চুক্তি হবে বলে নেতৃবৃন্দ আশা করেন।

  ইরানের সঙ্গে আলোচনায় রাজি ট্রাম্প

  প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ইরান পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হোক তা চায় না জি-৭। তবে এই অঞ্চল স্থিতিশীল থাকুক সেটিও চান বিশ্ব নেতৃবৃন্দ। রবিবার আকস্মিকভাবেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ ফ্রান্সের সম্মেলনস্থলে উপস্থিত হন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ইরানের সঙ্গে নতুন পরমাণু চুক্তি করতে রাজি আছেন জানিয়ে বলেন, আড়াই বছরের আগের ইরান এবং এখনকার ইরানের মধ্যে অনেক পার্থক্য। তিনি বলেন, ইরান একটি ভাল দেশ হতে পারে। তবে তারা পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না। ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে বৈঠকে রাজি হওয়ার আগে তাদের ভাল খেলোয়াড়ের ভূমিকা পালন করতে হবে বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। এর আগে ইরানের প্রেসিডেন্টও বলেছিলেন, তেহরান লাভবান হলে তিনি যে কারো সঙ্গে বৈঠক করতে রাজি। 

আরো যেসব বিষয় আলোচনা হয়  


জি-৭ জোটে ফের রাশিয়ার অন্তর্ভূক্তি দাবি করলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেন, রাশিয়া একটি শক্তিশালী দেশ। তাকে ফিরিয়ে আনাই ভাল হবে। এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, এ নিয়ে রাজনৈতিকভাবে তিনি কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন সেই বিষয়কে পরোয়া করেন না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার কারণেই রাশিয়াকে বাদ দেওয়া হয়। অনেকের চেয়ে পরিবেশ সম্পর্কে ভাল ধারণা রাখেন উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, আমি বিশুদ্ধ জল ও বায়ু চাই। কিন্তু আমি আমার দেশকেও সম্পদশালী দেখতে চাই। ইউক্রেন ইস্যুতে ভাল ফল পেতে জার্মানি ও ফ্রান্স নরম্যান্ডিতে শিগগিরই একটি বৈঠকে মিলিত হবে বলে একমত হয়েছেন নেতৃবৃন্দ। ক্রিমিয়া দখলের অভিযোগে ২০১৪ সালে রাশিয়াকে বাদ দেওয়া হয়। নেতৃবৃন্দ স্থিতিশীল লিবিয়া গঠনে সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান এবং যুদ্ধবিরতির জন্য চুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বৈঠকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেল ব্রেক্সিট ইস্যুতে কথা বলেন।


যদিও অনেকেই বলছেন,
ব্যাপক মতানৈক্যের কারণে বড় ধরনের অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হলো বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলো নিয়ে গঠিত সংস্থা- দ্য গ্রুপ সেভেনের (জি-৭) ৪৫তম শীর্ষ সম্মেলন। ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এবারই প্রথম সম্মেলন শেষ হয়েছে, যেখানে বিশ্বনেতাদের পক্ষে যৌথ কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

 সোমবার (২৬ আগস্ট) ফ্রান্সের দ্বীপশহর বিয়ারিজে তিন দিনব্যাপী সম্মেলনের ইতি টানা হয়। এর আগে শনিবার ( ২৪ আগস্ট) এ সম্মেলন শুরু হয়।   বিশ্ব বাণিজ্য ও ইরান ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ব নেতাদের আলোচনায় স্থান পায় ইউক্রেন, লিবিয়া, হংকং, জলবায়ু ও ব্রেক্সিট ইস্যু। এছাড়া জি-৭ এ রাশিয়ার ফের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাবও আলোচনায় আনেন বিশ্বনেতাদের কেউ কেউ।   এবারের বৈঠকে গত রোববার (২৫ আগস্ট) আকস্মিক উপস্থিত হয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ সবাইকে চমকে দেন।   ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, তেহরানের সঙ্গে পশ্চিমাদের ভেস্তে যাওয়া পরমাণু চুক্তি এবং এ অবস্থায় ইউরোপের করণীয় নিয়ে সম্মেলনের ফাঁকে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে আলোচনার উদ্দেশ্যে সম্মেলনে উপস্থিত হন তিনি। 

 আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বলছে, বৈঠক শেষে বাণিজ্য বিষয়ে মতানৈক্যের কারণে কমিউনিকউ বা যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।   এর আগে বৈঠক শুরুর পরদিন রোববার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানান, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে- এটি নিশ্চিত করার ব্যাপারে কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র একমত হয়েছে। 

 এদিকে জি-৭ এ পুনরায় রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে প্রস্তাব তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ইউরোপ ও কানাডা এ ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখায়। আপত্তি হিসেবে তারা ‘অবৈধভাবে’ রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের বিষয়টি সামনে আনে। ২০১৫ সালে এ কারণেই জি-৭ থেকে বহিষ্কৃত হয় রাশিয়া।   অন্যদিকে রোববার সকালে ব্রেক্সিট ইস্যু ও নতুন বাণিজ্য চুক্তি বিষয়ে যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সঙ্গে বৈঠক করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।   বরিসকে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য খুব দ্রুত ‘অভূতপুর্ব বিশাল এক বাণিজ্য চুক্তিতে’ পৌঁছাতে পারবে।   

   এর কারণ হিসেবে ট্রাম্প বলেন, যেহেতু কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে যুক্তরাজ্যের কোনো বাধা নেই, সেজন্য এটি সম্ভব হবে। এ ধরনের বাধা আছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ক্ষেত্রে।   ট্রাম্পের এ ধরনের মন্তব্যকে ইইউর সমালোচনা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

  ব্রেক্সিট ইস্যুতে বরিসকে কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে ব্যাপক উচ্ছ্বাসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, বরিসের কোনো পরামর্শের দরকার নেই। এ কাজের ব্যাপারে তিনি যোগ্য ব্যক্তি।  অন্যদিকে ট্রাম্পের সঙ্গে দহরম মহরম দেখা গেলেও ব্রেক্সিট ইস্যুতে ইউরোপের মিত্র দেশগুলোকে হতাশ করেছেন বরিস জনসন।   বরিস বলেন, আগামী ৩১ অক্টোবর তার দেশ যদি কোনো চুক্তি ছাড়া ইইউ থেকে বেরিয়ে যায়, সেক্ষেত্রে তিনি ব্রেক্সিট বিলবাবদ কোনো টাকা-পয়সা দিতে পারবেন না। 

 এবারের সম্মেলনে বাণিজ্যযুদ্ধ ও জলবায়ু নিয়ে আলোচনা হয় সম্মেলনে। এসব প্রসঙ্গেও ট্রাম্পের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দেয় বাকিদের। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক ইরান, চীন, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের ওপর বাণিজ্যকর, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেই চলেছেন। এ ব্যাপারে তারা কোনো লাগাম টানার লক্ষ্মণও দেখা যাচ্ছে না।   অন্যদিকে জলবায়ু প্রশ্নেও বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির ব্যাপারটিকে তিনি তেমন বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না বলে নানা সময়ে বলেছেন। ফলে এ ব্যাপারে তার দিক থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।   এছাড়া ফেসবুক, গুগলের মতো ডিজিটাল মাধ্যমগুলোতে করারোপ করার ব্যাপারে ফ্রান্সের প্রস্তাব থাকলেও সে ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছে ট্রাম্পের দেশ। 

  তবে আমাজনে দাবানল ইস্যুসহ দু-একটি ব্যাপারে কর্মপন্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রে একমত হয়েছেন বিশ্ব নেতারা।   এছাড়া বৈষম্য বিশেষ করে লিঙ্গ বৈষম্য, জি-৭ ও আফ্রিকার যৌথ অংশীদারিত্ব, জীববৈচিত্র্য ও ডিজিটাল মাধ্যমের মুক্ত, অবাধ ও নিরাপদ রূপান্তরের বিষয়েও একমত হন তারা। 

এবারের জি-৭ সম্মেলন শুরুর আগে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রধান ডোনাল্ড টাস্ক বিশ্বনেতাদের এই বৈঠককে অনেক জরুরি বিষয়ে একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু প্রত্যাশিত সেসব সাফল্যের মুখ না দেখেই পর্দা নামলো সম্মেলনের।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad