চল্লিশ বছরেরও
বেশি সময় ধরে যৎসামান্য পারিশ্রমিকে বা বিনা পারিশ্রমিকে রোগী দেখে
চলেছেন ডা. গৌরাঙ্গ গোস্বামী। কলকাতার কালনা এবং তার আশপাশের অঞ্চলে
তিনি বিখ্যাত ‘পাঁচ টাকার
ডাক্তার বাবু’ নামে।পাশাপাশি বামপন্থী রাজনীতিতে এখনো সক্রিয় কর্মী তিনি। কিন্তু
রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা কোনো শ্রেণিগত বিভেদের কারণে এই চিকিৎসক কোনো দিন কোনো
রোগীকে ফেরাননি বলে দরাজ ‘সার্টিফিকেট’ দিয়ে রাখছেন এলাকাবাসীরাও। বামপন্থী
গৌরাঙ্গের প্রশংসায় পঞ্চমুখ স্থানীয় তৃণমূল কিংবা বিজেপি সমর্থকরাও। রাজনৈতিক
হানাহানির এই সময়ে দাঁড়িয়ে তাই কালনার ভূমিপুত্র গৌরাঙ্গ এক বিরল চরিত্র।
১৯৭৮ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন গৌরাঙ্গ।
তারপরে ভর্তি হন ‘এমএস’–এর পঠনপাঠনে। কিন্তু সেই পড়াশুনো শেষ করতে
পারেননি। কারণটা রাজনৈতিক। ততদিনে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে
পড়েছিলেন তিনি। তাই পরে উত্তরবঙ্গের একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চাকরি পেয়েও
কালনাতেই ফিরে আসেন তিনি। সেখান থেকেই শুরু। ন্যূনতম পারিশ্রমিকে রোগী দেখা শুরু
করেন তিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় নানা জিনিসের দাম বাড়লেও
গৌরাঙ্গের পারিশ্রমিক বেড়ে হয়েছে মাত্র পাঁচ টাকা! নিজের বাড়িতেই চেম্বার বানিয়ে
রোগী দেখেন গৌরাঙ্গ।
গৌরাঙ্গ গোস্বামী বলেন, ‘ওই সরকারি চাকরিটায় যোগ দিলে বদলি হতেই হতো। কোথায় কখন থাকতে হতো কে
জানে? কালনার মানুষের সেবা করার সুযোগ পেতাম কি না, সেটাও নিশ্চিত নয়। তাই ভাবলাম
চাকরি ছেড়ে এখানেই প্র্যাক্টিস শুরু করা যাক।’সকাল দশটা থেকে শুরু হয় গৌরাঙ্গের রোগী দেখা। দুপুর ১টা পর্যন্ত রোগী
দেখে ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নেন তিনি। তারপরে দুপুর ৩টে থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত
দ্বিতীয় দফায় তার সময় কাটে রোগী–স্টেথোস্কোপ–প্রেসক্রিপশন নিয়ে। ফের এক ঘণ্টা বিশ্রাম।
তারপরে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত একটা–দেড়টা পর্যন্ত এছাড়াও ইমার্জেন্সি কল এলে
উনি চুপ করে বসে থাকেন না।
বিশ্রামের সময় কাটছাঁট করেই নিজের মোটরবাইকে চড়ে রোগী দেখতে ছোটেন
গৌরাঙ্গ। তিনি বলছিলেন, ‘রাত একটা পর্যন্ত
রোগী দেখি মানে এমন নয় যে তারপরে রোগী এলে দেখব না। আমার বাড়ির দরজা রোগীদের জন্য
সবসময়ই খোলা।’ দৈনিক দু’শো থেকে আড়াইশোজন রোগীর চিকিৎসা করতে হয়
তাকে।কিন্তু মাত্র পাঁচ টাকা পারিশ্রমিক নিয়ে সব সাংসারিক প্রয়োজন মেটে?
গৌরাঙ্গ বললেন, ‘আমি যে
জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত, তাতে এর চেয়ে বেশি টাকা লাগে না। তাছাড়া একজন কমিউনিস্টের
জীবন এ রকমই হওয়া উচিত।
No comments:
Post a Comment