একইরকমভাবে জলের গভীরে অনেক কিছুই চাপা পড়ে যায়। হারিয়ে যায় চিরকালের মতো। হ্যাঁ, সেরকমই আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের। এবং এর জন্য আমরা মানুষেরাই দায়ী। বলা অসঙ্গত হবে না, যা এই মুহূর্তে অনেকে হেলায় উড়িয়ে দিতে পারেন, আগামী দিনে তাই হতে চলেছে। আমাদেরই হয়ে এই কাজটি করবে প্লাস্টিক। সুউচ্চ পর্বত থেকে সমুদ্রের তলদেশ সর্বত্র তার অবাধ বিচরণ। ১৯০৭-এ বেলজিয়ামের রসায়নবিদ লিও হেনড্রিক বেকেল্যান্ডের
(১৮৬৩-১৯৪৪) সৃষ্টি। এরপর বিজ্ঞানের হাত ধরেই বেকেল্যান্ডের তৈরি সিন্থেটিক প্লাস্টিকের বিবর্তন ঘটেছে। এই প্লাস্টিক পরিবেশে মেশে না, পৃথিবীতে থেকে যায় বহু বছর। অনিয়ন্ত্রিত প্লাস্টিকের ব্যবহার এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলার ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত এই মুহূর্তে প্লাস্টিকবর্জ্যে পরিপূর্ণ। আতঙ্কের বিষয় হল, এই আবর্জনায় শুধু পৃথিবীর স্থলদেশই আক্রান্ত নয়, দূষিত জলভাগও। এবং তা শুধুমাত্র উপরিস্তরেই নয়। জানা গেছে, পৃথিবীর গভীরতম বিন্দু মারিয়ানা ট্রেঞ্চেও প্লাস্টিক পৌঁছে গেছে।
এরও আগে ১৯৮৮–তে আমেরিকার ন্যাশনাল ওসেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জানিয়েছিল উত্তর আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরে (১৩৩০-১৫৫০ পঃ দ্রাঘিমাংশ, ৩৫০-৪২০ উঃ অক্ষাংশ) ৭০,০০০ বর্গকিমি জুড়ে তৈরি হয়েছে প্লাস্টিকের পাহাড়। যা গ্রেট প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচ নামে পরিচিত। এই পরিমাণ তুলনা করলে তিনটি ফ্রান্সের সমান হবে। কিছুদিন আগেও খবরে প্রকাশিত হয়েছিল, একটি তিমির শরীরেও প্লাস্টিক পাওয়া গিয়েছে। ব্রিটেনের রয়াল স্ট্যাটিস্টিক্যাল সোসাইটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে একটি পরিসংখ্যান তৈরি করেছে।
তালিকাভুক্ত পরিসংখ্যানে প্লাস্টিকবর্জ্যের হিসেবে বলা হয়েছে কী পরিমাণ প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের জন্য। তাদের হিসেব অনুযায়ী বিশ্বে যত প্লাস্টিক ব্যবহার হয়, তার ৯০.৫০% বর্জ্যে পরিণত হয়। এই প্লাস্টিকের একটা অংশ আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে সাগর মহাসাগরে। এ কারণে বিশ্বব্যাপী পরিবেশের ওপর প্লাস্টিকবর্জ্যের প্রভাব ২০১৮ সালে বারবার শিরোনাম হয়েছে।
অন্যদিকে, ৭ জুন ২০১৭ নেচার কমিউনিকেশনে প্রকাশিত, নেদারল্যান্ডের ওশন ক্লিন-আপ ফাউন্ডেশনের ‘রিভার প্লাস্টিক এমিশন টু দ্য ওয়ার্ল্ড’স ওশনন্স’ রিপোর্টে গবেষকগণ জানিয়েছেন প্রতি বছর ১১.৫–২৭.৪ লক্ষ টন প্লাস্টিক নদীর মাধ্যমে সমুদ্রে মিশছে। যার ৭৪% আসে মে–অক্টোবর মাসে। এই কৃতিত্বে ভারতের লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম গঙ্গার স্থান পৃথিবীতে দ্বিতীয়। প্রতি বছর ১ লক্ষ ২০ হাজার
টন প্লাস্টিক বয়ে বঙ্গোপসাগরে ফেলছে। প্রথম স্থানে রয়েছে চীনের ইয়াংসে, বছরে ৩ লক্ষ ৩০ হাজার টন। ওই রিপোর্টে আরও জানা গেছে, পৃথিবীর ৬৭ শতাংশ দূষিত নদী এশিয়া মহাদেশে অবস্থিত। সমীক্ষায় আরও উঠে এসেছে কেবল প্রশান্ত মহাসাগরে ১.৮ ট্রিলিয়ন প্লাস্টিক সংখ্যায় রয়েছে। যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার নিরিখে মানুষ পিছু ২৫০টি। একই মত প্রকাশ করেছে জার্মানির একটি গবেষণা সংস্থা। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের মাত্র ১০টি নদীর মাধ্যমে ৭৫ শতাংশ সমুদ্রদূষণ হয়, এসব নদীর অধিকাংশই এশিয়ায়।
সাগর মহাসাগরে তিমির ন্যায় সর্বভুক প্রাণীও প্লাস্টিক খায়। যার পরিণাম বিপন্ন প্রজাতির স্পার্ম হোয়েল-এর মৃত্যু। শুধু তিমি নয় আইইউসিএন-এর সঙ্কটাপন্ন তালিকায় থাকা আরও অনেক সামুদ্রিক প্রাণী প্লাস্টিক খেয়ে মারা যাচ্ছে যা অতিকায় তিমির মতো সহজে নজরে আসে না। কেন সামুদ্রিক প্রাণী প্লাস্টিক খেয়ে মারা যাচ্ছে? এ সম্পর্কে নেদারল্যান্ডসের রয়াল ইনস্টিটিউট ফর সি রিসার্চের গবেষক এরিক জেটলার জানিয়েছেন, সমুদ্রে সব প্লাস্টিকের ওপরই দ্রুত এক ধরনের মাইক্রোব বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র
জীবাণুর আস্তরণ পড়ে।
বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘প্লাস্টিস্ফেয়ার’। এই পিচ্ছিল জীবন্ত আস্তরণ থেকে এক ধরনের রাসায়নিক নির্গত হয়, সেটাই আসলে প্লাস্টিককে লোভনীয় খাদ্যে পরিণত করে। এবং প্লাস্টিক থেকে তখন খাদ্যের মতোই গন্ধ বের হয় এবং এর স্বাদও হয় সেরকম। এক্ষেত্রে ডাইমিথাইল সালফাইড (ডিএমএস) নামক একটি যৌগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের ২৭ এপ্রিল ২০১৭ সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ২০৫০ সালে সমুদ্রে মাছের চেয়ে প্লাস্টিকের পরিমাণ ছাড়িয়ে যাবে।
গত ২০১৭-এর ডিসেম্বরে সমুদ্র প্লাস্টিকমুক্ত করতে একজোট হয়ে বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশ ‘নাইরোবি রিজোলিউশন’–এ সই করে। লক্ষ্য ২০২৫–এর মধ্যে সমুদ্র প্লাস্টিকমুক্ত করা। সত্যি সত্যিই এর থেকে রক্ষা পেতে হলে সার্বিক সচেতনতার পাশাপাশি জরুরি প্লাস্টিকের সঠিক প্রয়োজন নিরূপণ করা তারপর এর উৎপাদন করা। কাজটা একপাক্ষিক নয়। এর জন্যে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ আর সংশ্লিষ্ট সকলের পরিকল্পনা রূপায়ণের সদিচ্ছা।
No comments:
Post a Comment