কম বেশি খেতে ভালোবাসি আমরা সকলেই। রোজ আমরা এমন কিছু খাবার খাই, যেগুলো আসলে আমাদের ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আপাত নিরীহ এই খাবারগুলো আসলে সমস্যা বাড়ায় আমাদের। হার্ট ডিজ়িজ়, হাই ব্লাডপ্রেশার, হাই কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, অ্যালঝাইমার্স, ক্যানসার যে কোনও রোগই বাড়বে এই খাবারগুলোয়। মোটা হতে শুরু করবেন প্রথমদিকে, তাতে আপনার মনে হবে , এ আর এমন কি ব্যাপার, কিন্তু কান টানলে মাথা আসার মতোই মোটা অবস্থা থেকেই আপনার শরীরে বাসা বাধবে শত শত রোগ।
কী সেই ২০ টি খাবার, যা আপনাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, জেনে নিন–
ক্যানড টোম্যাটো সস্
টোম্যাটো সস্ যখন খান, কখনও হয় তো কল্পনাও করতে পারেন না এতে থাকা সুগার আপনার ডায়াবেটিস, ওবেসিটি, হার্ট ডিজ়িজ়, দাঁতের সমস্যা করতে পারে। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। তাই এই সস্ পারলে আজ থেকে ত্যাগ করুন। এতে থাকা অতিরিক্ত চিনি আপনার ওবেসিটিও বাড়িয়ে দেয়। চেষ্টা করুন, কাঁচা টোম্যাটো থেকে বাড়িতে পিউরি তৈরি করে নিতে। তাতে আপনার স্বাদ মতো টক , ঝাল মিশিয়ে নিন। এতে বাড়তি চিনির সমস্যা কমবে। নিতান্তই খেতে হলে, এমন কোনও ব্র্যাণ্ডের সস্ কিনুন, যাতে বাড়তি সোডিয়াম এবং সুগার নেই।
সোডা
বাজারে কিনতে পাওয়া যায়, এমন যে কোনও সোডা, কোল্ড ড্রিঙ্ক, ফ্রুট জুস আপনার ওজন বাড়িয়ে দেয়। এতে থাকা রাসায়নিক, প্রিজ়ার্ভেটিভ, আলাদা সুইটনার, রঙ কোনওটাই তো আপনার জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। যদিও বিজ্ঞাপনে অনেক সময় দেখানো হয়, বেশ কিছু ড্রিঙ্কে আপনি এনার্জি পাবেন, ভিটামিন পাবেন। কিন্তু সেগুলো একটাও কাজের কথা নয়। এগুলো আপনার ব্লাডসুগার , স্কিন, হরমোন, মুড—সবেতেই প্রভাব ফেলে। তাই এগুলোর বদলে, বাজার থেকে ফল কিনে আনুন, আর জুসারে জুস করে খেয়ে নিন সহজেই। এতে পুষ্টিগুণও বজায় থাকবে, আর ক্ষতিও এড়ানো যাবে অনেকটাই।
চিনি
চিনির প্রতি আমাদের দুর্বলতা তো অনেকেরই থাকে। কিন্তু, চিনি তো আমাদের বুড়িয়ে দেয়। তাছাড়াও মোটা করে দেয়, হার্টের সমস্যা বাড়ায়, ক্যানসারের সূচনা করতে পারে। এরকম লম্বা লিস্ট রয়েছে চিনির ক্ষএে। তাই চিনি খাওয়া ছেড়ে দিন পারলে। বদলে খান ফল আর মধু। এতে আপনার স্বাদও ঠিক থাকবে। শরীরের সমস্যাও কমবে।
প্রসেসড মিট
আজকাল আমরা অনেকেই বাজারে গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে মাংস কাটিয়ে আনি না। বিভিন্ন শপিং মলের দোকানে গিয়ে প্যাকেটে রাখা প্রসেসড মিট নিয়ে আসি। কিংবা নিয়ে আসি সসেজ, সালামি। সেগুলো ফ্রিজে রেখে অনেকদিন ধরে খাইও। এটা কতটা বিপজ্জনক জানলে, হয় তো আর সাহস করবেন না। এই মাংস অনেকদিন ধরে রেখে দিতে হয় বলে, একে নাইট্রেট, সোডিয়াম, প্রিসার্ভেটিভ, বিভিন্ন রাসায়নিক দিয়ে রাখা হয়। ফলে সেটা আমাদের শরীরে ক্যানসার, হার্টের সমস্যা, ডায়াবেটিস, বিহেভিয়েরাল সমস্যা বাড়াতে থাকে। আর শিশুদের মধ্যে তো এই সমস্যাগুলো বেড়েই যায়। তাই ছোট থেকে এ জাতীয় খাবার ওদের না দেওয়াই ভালো। বরং বাজারে গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে মাংস কাটিয়ে বাড়ি ফিরুন, এড়িয়ে চলুন প্রসেসড মিট।
ভেজিটেবল অয়েল
রান্নার স্বাদ বাড়ানোর জন্য মনের আনন্দে তো ভেজিটেবল অয়েল দিয়ে রান্না করেন, কিন্তু জানেন কি এতে থাকা ট্রান্সফ্যাট আপনার ক্যানসার, অ্যালঝাইমার্স, ওবেসিটি, কার্ডিও ভাসকুলার ডিজ়িজ় বাড়িয়ে দেয়। চেষ্টা করতে পারেন, এর বদলে অলিভ অয়েল, অ্যাভোকাডো অয়েল বা নারকেল তেলে রান্না করতে।
মার্জারিন
ট্রান্সফ্যাট আপনার হার্ট, ব্লাড ভেসেল, কোলেস্টরলে প্রভাব ফেলে। মার্জারিনে এই ট্রান্স ফ্যাটই থাকে। হয় তো আপনি ভাবতেই পারছেন না! শুধু তাই নয়, মার্জারিনে থাকে এমন কিছু রাসায়নিক, হাইড্রোজেনেটেড ভেজিটেবল অয়েল যা আসলে ক্ষতি করে আপনারই। এর চেয়ে এমনি মাখন খান বা অলিভ অয়েল, অ্যাভোকাডো অয়েল খান। তবে মার্জারিনকে দূরেই রাখুন।
হটডগ
কোথাও বেড়াতে গেলে, হটডগের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন কি? আর থাকবেন না, কারণ, সমীক্ষার রিপোর্ট বলছে, একটা সিগারেটের ধোঁওয়াতেও যে ক্ষতি , সেই সমান ক্ষতি হটডগেও! এতে থাকা সোডিয়াম এবং টক্সিনের পরিমাণ এতটাই বেশি যে, আপনার ক্যানসারের রিস্ক অনেকটাই বেড়ে য়ায় এতে। তাই কেমিক্যাল সর্বস্ব এই হটডগের বদলে চেষ্টা করুন বাড়িতে তৈরি ফ্রেশ মিটের কোনও চটপটে খাবার খেতে।
পোটাটো চিপ্স
যে কোনও ভাজা খাবারে আমাদের মন ভালো হয়ে যায়। কিন্তু যখনই আপনি ডিপ ফ্রায়েড কিছু খান, আপনার প্রিয় ফ্রেঞ্চফ্রাইও তার মধ্যে একটা কিন্তু। ডিপ ফ্রাই করা যে কোনও খাবারে অ্যাক্রিলামাইড যৌগ তৈরি হয়। যেটা আপনার কোলন, ব্রেস্ট, প্রস্টেট, রেক্টাম ক্যানসারের সম্ভাবনাকে অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। তাই চেষ্টা করুন এ জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে। আর নিতান্তই খুব ইচ্ছে করলে, বাড়িতে আলু কেটে তাতে অলিভ অয়েল স্প্রে করে অল্প নুন ছিটিয়ে বেক করে খান। স্বাদে আপনার সমস্যা হবে না, আর শরীরের ক্ষতিও হবে না।
স্যালাড ড্রেসিং
স্যালাড খেতে গেলেই তার ড্রেসিং ছাড়া মুখে রোচে না আপনার? বিপদ আসন্ন কিন্তু। কারণ এই স্যালাড ড্রেসিং অনেকটা ওই হটডগ আর ফ্রেঞ্চফ্রাইয়ের মতোই মারাত্মক ক্ষতিকর। তার চেয়ে লেবুর রস , অ্যাপেল সিডার ভিনিগার, বালসেমিক ভিনিগার ছড়িয়ে নিন আপনার স্যালাডে, আর নিজের ক্ষতি যতটা পারবেন এড়িয়ে চলুন।
আর্টিফিশিয়াল সুইটনার
ডায়াবেটিক হলে অনেকেই মনের আনন্দে সুগার ফ্রির মতো জিনিসে চোখ বুজে ভরসা করেন। আর বাড়িতে হওয়া পায়েস থেকে কেক সবেতেই প্রিয়জনকে বাদ দেন না, খাবারে সুগার ফ্রি আছে ভেবে। কিন্তু এতে ডায়াবেটিসের সমস্যা, হাই ব্লাড প্রেশার, হার্ট প্রবলেম, মেটাবলিক সিণ্ড্রোম অনেকটাই বেড়ে যায়। এতে থাকা রাসায়নিক অ্যাসপার্টেম আসলে আপনার ক্ষতিই করে। তাই মিষ্টি ছাড়া খাবারের অভ্যাস করে ফেলুন, নয় তো মধু, ম্যাপেল সিরাপের উপর ভরসা করতে শুরু করুন।
অ্যালকোহল
ক্ষতি ছাড়া এতে বিশেষ কিছুই হয় না। অত্যন্ত বেশি ক্যালোরির এই পানীয়তে আপনার ওজন বাড়তে পারে, লিভার ড্যামেজ হতে পারে, ডিহাইড্রেশন, ডিপ্রেশন, স্কিন প্রবলেম সবই হতে পারে। তাই ব্রেন থেকে লিভার, সব অসুস্থ না করতে চাইলে ছেড়ে দিন অ্যালকোহল। আর সুস্থ থাকুন।
ময়দা
রিফাইণ্ড ময়দা কতটা ক্ষতিকর আপনার জানা আছে তো? সাদা পাঁউরুটি এড়িয়ে চলুন। ময়দাতে থাকা ভিটামিন, মিনারেলস, নিউট্রিশনাল ফাইবারে রাসায়নিক মিশে সব পুষ্টিগুণই তলানিতে গিয়ে ঠেকে। এই রাসায়নিক মেশানোই হয় যাতে ময়দার সাদা রঙটা বেশি মনে হয়। অথচ শরীরের সমস্যা বেড়ে যাবে এতে। থাইরয়েড, বিভিন্ন অঙ্গহানি পর্যন্ত হতে পারে এতে।
দুধ
সকালে উঠেই আমরা অনেকেই প্রথমে দুধ খাই অনেকেই। কিন্তু মাতৃদুগ্ধ আর গরুর দুধে তফাৎ আছে। যত আমাদের বয়স বাড়ে, আমাদের মধ্যে ল্যাকটোজ় ইনটলারেন্স বাড়তে থাকে। আসলে এই প্যাকেটজাত গরুর দুধে আপনার আর্থ্রারাইটিস, ক্যানসার, অ্যালার্জি, হাঁপানি ইত্যাদি বাড়তে থাকে। তাই বিজ্ঞাপন দেখে এই দুধ না খেয়ে, নারকেলের দুধ খেতে শুরু করুন। এর স্বাদ কিন্তু কম নয় মোটেও।
বারবিকিউ চিকেন
আমরা চিকেনের বিভিন্ন রেসিপিতে যথেষ্ট খুশিই হই। কিন্তু যখন বারবিকিউ করা হয় চিকেন, তখন তাতে যে পরিমাণ রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় তাতে প্যানক্রিয়াসের ক্যানসার, ব্রেস্ট ক্যানসারের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই আপনার খাবারের কার্সিনোজেনের মতো ক্ষতিকারক যৌগের পরিমাণ এড়াতে বারবিকিউ চিকেন না খেয়ে , রোজ়মেরি অ্যাড করতে পারেন চিকেনে।
এনার্জিবার
আপনি যদি অ্যাথলিট না হন, তাহলে চেষ্টা করুন এই এনার্জিবারগুলো এড়িয়ে চলতে। এতে থাকা প্রচুর সুগার আপনার জন্য ক্ষতিকর। এতে থাকা ফ্রুক্টোস কর্ণসিরাপ, প্রিজ়ার্ভেটিভ, ট্রান্সফ্যাট আপনার জন্য মোটেও ঠিক নয়। তাই খুব প্রয়োজন না হলে চেষ্টা করুন এই এনার্জিবার নিজে না খেতে এবং বাচ্চাকে না দিতে।
গম
আপাত নিরীহ গমেও সমস্যা আছে! অবাক হবেন না। গম আপনার ব্লাডসুগার লেভেল বাড়িয়ে দেয়। গম থেকে তৈরি করা যে কোনও খাবারে আপনার শরীরে ইনসুলিন বেশি মাত্রায় তৈরি হতে থাকে। প্যানক্রিয়াস এ সময়ে দ্রুততার সাথে কাজ করে। আপনি ডায়াবেটিক হয়ে পড়েন। এতে আপনাকে দেখতেও অনেকটা বুড়োটে লাগে। তাই গমের তৈরি করা খাবার পারলে এড়িয়ে চলুন।
ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল
সকালের খাবারে প্রচুর রঙ-বেরঙের খাবার আমরা খেয়ে থাকি। এগুলোয় প্রচুর পরিমাণে প্রিজ়ার্ভেটিভ, রাসায়নিক, আর্টিফিশিয়াল সুগার দেওয়া থাকে। তাই সে সব ছেড়ে বরং চেষ্টা করুন সকালের খাবারে ওটমিল খেতে, সঙ্গে নিতে পারেন কিছু ড্রাই ফ্রুট বা ফ্রেশ ফ্রুট। তাতে পেটও ভরবে সহজেই।
ফ্রুটজুস
যে কোনও ফ্রুটজুসেই ১০০ শতাংশ টাটকা ফলের কথা বলা হয়। আসলে যে তা থাকে না, তা নিশ্চয় আপনার জানা আছে? এতে রাসায়নিক, রঙ, প্রিজ়ার্ভেটিভ সবই থাকে। তাই সামান্য পুষ্টিগুণ থাকলেও তা নষ্ট হয়ে যায়। তাই চেষ্টা করুন বাড়িতে ফল কিনে এনে জুস করে খেতে। তাতে স্বাদ এবং পুষ্টি কোনওটাই মন্দ হবে না।
নুন
খুব বেশি নুন খান কি? ভীষণভাবে ব্লাড প্রেশার বাড়বে আপনার। এতে হার্টের সমস্যাও হবে স্বাভাবিকভাবেই। সমীক্ষায় দেখা গেছে, এ কারণে প্রচুর পরিমাণে মৃত্যুও হয় সারা বিশ্বে। একেবারে আলুনি হতে হবে না আপনাকে, তবে মাথায় রাখবেন পরিমাণ কমিয়ে দেবেন। মনে রাখবেন, একদিনে আপনার শরীরে ৩.৭৫ গ্রাম সোডিয়ামই যথেষ্ট। কোনওভাবে সেটা ৬ গ্রাম পেরিয়ে গেলে মারাত্মক আকার নিতে পারে।
তাই চেষ্টা করুন, এই ২০ টি খাবার এড়িয়ে চলতে, নইলে দ্রুত নিজের শেষ ডেকে আনবেন।
from ap bangla | অ্যানালিটিক্যাল প্রেস | Analytical Press | http://bit.ly/2EBS4zZ

No comments:
Post a Comment