নিজস্ব প্রতিনিধি, মধ্যমগ্রাম
লোকসভা জয়ের পর বাংলার পুরসভায় তৃণমূলকে ভেঙে বিধানসভা দখলের ইনিংস শুরু করল বিজেপি।মুকুল রায়ের নেতৃত্বে ভেঙে চুরমার হওয়া গড় বাঁচাতে কোর কমিটির বৈঠকে বসলেন তৃণমূলের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা নেতৃত্ব । যদিও বৈঠকেই ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে অর্জুন ঘনিষ্ঠ এবং ভগ্নিপতি তথা নোয়াপাড়ার বিধায়ক সুনীল সিংহের মন্তব্য। দিল্লিতে জেলার কাঁচরাপাড়া , হালিশহর,নৈহাটি , ভাটপাড়া এই চার পুরসভার গরিষ্ঠ অংশের কাউন্সিলার সহ বীজপুরের তৃণমূল বিধায়ক শুভ্রাংশু রায় বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় তৃণমূল কার্যত তাসের ঘরের মত ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ল। উত্তর চব্বিশ পরগনার তৃণমূল কংগ্রেস জেলা সভাপতি তথা খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক এই ভাঙনকে পিস্তলের বাটের কাছে আত্মসমার্পন আখ্যা দিলেন।
লোকসভায় ফেরার পর বিজেপি রাজ্যে প্রথম ধাক্কা দিল উত্তর চব্বিশ পরগনায়। শোনা যাচ্ছে পরের ধাপে ভাঙার অপেক্ষায় তৃণমূলের বনগাঁ র গড় সহ বেশ কিছু পঞ্চায়েত ও পুরসভা। মঙ্গলবার দিল্লিতে বিজেপির সদর কার্যালয়ে যখন বিজেপিতে তৃণমূলের ৩ বিধায়ক এবং ৪ পুরসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্সিলর ও একাধিক নেতা যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে। ঠিক সেই সময় মধ্যমগ্রামে উত্তর চব্বিশ পরগনার জেলা পার্টি অফিসে ভেঙে পড়া গড় বাঁচাতে বৈঠকে বসে তৃণমূল নেতৃত্ব। চারটি পুরসভা হাতছাড়া হওয়ায় তৃণমূল এখন কার্যত দূর্বল।
মুকুল পুত্র শুভাংশুর মত অর্জুন ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ভগ্নিপতি তথা নোয়াপাড়ার বিধায়ক সুনীল সিংহের বিজেপিতে যোগদান পর্বও হতে পারে সময়ের অপেক্ষা। বিজেপি সুত্রের খবর, জেলার জেলাপরিষদের বেশ কিছু সদস্য ছাড়াও পঞ্চায়েতের জনপ্রতিনিধি এবং মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার তৃণমূলের মেশিনারিরাও গেরুয়া শিবিরে যোগ দিতে তৈরি। নরেন্দ্র মোদীর শপথের পর শুরু হবে তৃণমূল ভাঙার পর্ব। এখবর ইতিমধ্যে তৃণমূল শিবির পেয়েছে। ফলে তৃণমূলের কাছে এখন ভাঙন ঠেকানো আর বিজেপিকে রোখা এই দুই কাজ এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে মধ্যমগ্রামের কেন্দ্রীয় কার্যালয়েই এদিন বৈঠকে বসে জেলা তৃণমুলের কোর কমিটির নেতৃত্ব। এদিন মুলত ব্যারাকপুর এবং বনগাঁ কেন্দ্রের ভোটের ফলাফলের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক হয়। নির্বাচন পরবর্তী পরস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনাও করেন জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক,তাপস রায়, নির্মল ঘোষরা। এদিনের বৈঠকে হাজির ছিলেন জেলার পুরসভার চেয়ারম্যান,বিধায়ক সহ মন্ত্রীরাও। ব্যারাকপুর এবং বনগাঁ কেন্দ্রের জন্য এদিনের কোর কমিটির বৈঠক থেকেই সাত জনের একটা কমিটি গঠন করেছে তৃণমুলের কোর কমিটি। এই কমিটিতে অাছেন পানিহাটির বিধায়ক নির্মল ঘোষ,বরাহনগরের বিধায়ক তাপস রায়,মদন মিত্র,নৈহাটির বিধায়ক পার্থ ভৌমিক,মধ্যমগ্রামের বিধায়ক রথিন ঘোষ,বিধাননগরের বিধায়ক সুজিত বসু এবং দমদমের বিধায়ক ব্রাত্য বসু। এই কমিটিই এবার থেকে ব্যারাকপুর এবং বনগাঁ কেন্দ্রের পরিস্থিতির উপর নজর রাখবেন। তাদের পর্যালেচনার উপরেই ব্যাবস্থা নেবে দল।
২০০৯ পরবর্তী অধ্যায়ে মুকুল রায়ের নেতৃত্বে বাম দূর্গে ধস নামাতে যে কাজ করতে হয়নি সেই কাজটি খোদ মুকুলের কূট চালের বিরুদ্ধে করতে হচ্ছে তৃণমূল নেতৃত্বকে। বৈঠকে তৃণমূল নেতৃত্বের কাছে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে , বিশ্বাস ও ভরসা। সুত্রের খবর, তৃণমূল নেতৃত্ব পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে পারছেন না জেলার বহু নেতা জনপ্রতিনিধির ওপর। যদিও খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের দাবি, মন থেকে কেউ দল ছেড়ে বিজেপিতে গেছে নাকি পিস্তলের বাটের ভয়ে গেছে তা দেখতে হবে।
এদিন সুনীল সিংহ সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ' কে দিল্লী গেছে , কে যায়নি বলতে পারবো না । এখনও আপনাদের সামনে আছি , দেখুন আগে কি হয় ' । সুনীলের বক্তব্য মানুষের রায় মেনে নিতে হবে আর দল তদন্ত করছে বিপর্যয়ের কারণ ।
' রিভলবারের বাঁট নাকি মানসিক কারণ ? ' কোন কারণে দলত্যাগী নেতারা তৃণমূল ছাড়ছেন তা এখনও স্পষ্ট নয় জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের কাছে । ফলে ভীতিসঞ্চার করেই বিজেপি তৃণমূল দলকে ভাঙ্গছে এমন ইঙ্গিত দিয়েও স্ববিরোধীতার তত্ব দিলেন উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা সভাপতির গলায় । সুযোগ সন্ধানী নেতারা দল ছাড়ছে, কর্মীরা দলের সঙ্গেই আছে মুখে বললেও লোকসভা নির্বাচনে কার্যত ভরাডুবির পরে দলের ভাঙ্গন রুখতে ও বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে উত্তর চব্বিশ পরগনা তৃনমুল জেলা পার্টি অফিসে দলীয় নেতৃত্বকে কার্যত দিশেহারা দেখালো । বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে এসে ক্ষণে ক্ষণে খেই হারালেন তৃণমূল জেলা সভাপতি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক । জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের বক্তব্য মাঝে মধ্যেই থেমে যাচ্ছিল । তাঁকে সামাল দিতে হচ্ছিল তাপস রায় ও মদন মিত্র সহ নেতাদের ।
উল্লেখ্য , কোর কমিটির বৈঠক শেষ হওয়ার আগেই পার্টি অফিস ছেড়ে বেরিয়ে যান নোয়াপাড়ার বিতর্কিত তৃণমূল বিধায়ক সুনীল সিং। বললেন, 'গারুলিয়া পুরসভায় আজ বোর্ড মিটিং রয়েছে। তাই, তাড়াতাড়ি চলে গেলাম। দলকে আমার যা বলার বলেছি। দল বিবেচনা করবে।' দলীয় সূত্রের খবর, বৈঠকে তিনি দলের নেতাদের কড়া ভাষায় নিজের বক্তব্য পেশ করেছেন। সঙ্গে নোয়াপাড়ার সাংগঠনিক দায়িত্ব পাওয়ার দাবী নিয়ে সওয়াল করেছেন । উল্লেখ্য, নোয়াপাড়ার সাংগঠনিক রাশ আপাতত পার্থ ভৌমিকের কবজায় রয়েছে। সুনীল অবশ্য বিজেপিতে যোগদান প্রশ্ন এড়ালেন কৌশলে। তাঁর কৌশলী পদক্ষেপ কি ভাঙ্গনের আর একটি দিশা ! যা কার্যত লাখ টাকার প্রশ্ন ।

No comments:
Post a Comment