দেবশ্রী মজুমদার, রামপুরহাট, ২৬ অক্টোবরঃ দীপাবলি আলোর উৎসব। এসময় কেরোসিন শিখা না বললেও, বাহারি বিদ্যুৎ আলোর রোশনাই বাতি অবশ্যই ‘বলে মাটির প্রদীপে, ভাই বলে ডাকো যদি দেব গলা টিপে’। তাই এই মাটির প্রদীপের চাহিদাও দস্তুর কোনটায় নেই। সেই দিক থেকে এই বাতিকে আশ্চর্য প্রদীপ বলা যাবে না ঠিকই, তবে আজো যেখানে জ্বলে, সে ছুঁয়ে যায় সাবেকিয়ানা। কিন্তু যে সব শিল্পীরা তৈরী করে মাটির প্রদীপ। তারা কবি সুকান্তের বাতিওয়ালা। যারা রাস্তায় বাতি জ্বালিয়ে ফেরে। অথচ নিজের ঘরেই জমে থাকে দুঃসহ অন্ধকার। ঠিক যেন প্রদীপের তলায় অন্ধকার।
রামপুরহাট পুরসভার ১ নং ওয়ার্ডের শ্রীফলা রোডে এক ঘর কুমোরের বাস। এদের নেই নিজস্ব জায়গা। তাই রাস্তার ধারেই সরকারি জায়গায় খুঁজে নিয়েছে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই। গৃহ কর্তার নাম সীতারাম পণ্ডিত (৬৩)। স্ত্রী প্রমিলা দেবী ও তিন ছেলে, বৌমা, নাতি নাতনিদের নিয়ে মোট ৯জন সদস্যের সংসার। চার মেয়ের বিয়ে আগেই দিয়েছেন দেশের বাড়িতে। সীতারামবাবুর দেশের বাড়ি বিহারের ভাগলপুর জেলার সুলতান গঞ্জ থানার পয়সরাহা গ্রামে। সেই বিয়াল্লিশ বছর আগে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে এসেছিলেন।
তবে বছর দুয়েক হল স্ত্রীকে নিয়ে দেশের বাড়ি ফিরেছেন সীতারামবাবু। এখানেই রামপুরহাটেই তাঁর ছেলে মেয়ের জন্ম, বিয়ে সব কিছুই। রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড সব এখানেই। তবুও এখনও পর্যন্ত জায়গা কিনে বাড়ি করতে পারেন নি। নেই কোন পাট্টা। তাঁর ছেলে সঞ্জয় পণ্ডিত বলেন, দুটো চালার মধ্যে একটিতে মাটির জিনিস তৈরী করি। আরেকটিতে কোন রকমে সবাই মিলে থাকি। তাছাড়া নিজের জায়গা না থাকায় মাটির তৈরী প্রদীপ, ভাঁড় প্রভৃতি শুকোতে সমস্যায় পড়তে হয়। আগে একটা ফাঁকা জায়গায় শুকোতাম, কিন্তু বাড়ির পিছনে ক্লাব কর্তৃপক্ষ সেই জায়গা নিয়ে নেওয়ায়, সমস্যা আরো বেড়ে গিয়েছে। রেশনে পাই সপ্তাহে পাঁচ কেজি গম। আর দেড় লিটার তেল। সর্ষের তেল ভাল না হওয়ায় নিই না। নয় জন পোষ্য ওই রেশনে কিছু হয় না”।
সীতারাম বাবুর তিন ছেলের মধ্যে সঞ্জয় পণ্ডিত কুমোরের কাজ করেন। আর দুই ছেলের মধ্যে একজন ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রী এবং অন্যজন দিন মজুর। আয় বেশি না হওয়ায় তাঁরা তাদের জাত ব্যাবসা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান সঞ্জয়বাবু। তিনি বলেন, “ বেলে মাটিতে মাটির সামগ্রী ভাল হয়। এখানে বেশিরভাগ কাঁকুড়ে এঁটেল মাটি। তাই এখান থেকে ১৩ কিমি দূরে বৈধরা গ্রামের ব্রহ্মাণী নদের ধার থেকে বেলে মাটি আনাই। ট্রাক্টার প্রতি হাজার টাকা লাগে। এক ট্রাক্টর মাটিতে ষাট হাজার ভাঁড় ও তারও বেশি প্রদীপ তৈরী হয়। প্রতিদিন হাজার মত সামগ্রী তৈরী হলে, প্রায় দুমাস চলে যায়। একজন কর্মচারী আছে।
তাকে প্রতি হাজার প্রদীপ ও ভাঁড়ে একশ আশি টাকা লাগে। এছাড়াও জ্বালানী খরচে প্রতি হাজারে দেড়শ টাকা খরচ আছে। বাজার থেকে কাঁচা কয়লা, ঘুঁটে কিনে ভাটি তৈরী করি। সারা বছর ভাঁড় তৈরী করি। কেবলমাত্র কালিপুজোর আগে মাটির প্রদীপ তৈরী হয়। এই সময় প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজ করতে হয়। প্রদীপে হাজার প্রতি পাইকারি দরে তিনশ টাকার কিছু বেশি পাই। এই বছর দশ হাজার বরাত পেয়েছি। তবে ইলেকট্রিক আলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কঠিন। ভাঁড়ের ক্ষেত্রেও সমস্যা।
প্লাস্টিকের বাড়বাড়ন্ত আমাদের সমস্যায় ফেলেছে। সরকার আমাদের জন্য কিছু ভাবছে না। ঢালাইয়ের চাকা হাতে ঘুড়িয়ে, সানা মাটি দিয়ে বিভিন্ন সামগ্রী তৈরী করি। অল্প মূল্যে বিদ্যু পেলে ভাল হত। কাউন্সিলার সুদেব দাসকে বলেছিলাম, সরকারি প্রকল্পে বিদ্যুত ও খাস জমির পাট্টার জন্য”। পুরসভা সূত্রে জানা যায়, সঞ্জয় বাবু বিপিএল তালিকাভূক্ত। অল্পমূল্যে রেশন পান। তবে নিজস্ব জমি না থাকায় রাজীব গান্ধী বিদ্যুতায়ন প্রকল্পের সুবিধা উনি পান নি। তবে সেটা দেখা হবে”।
সঞ্জয় বাবু নিজের ঘূর্নীয়মান ঢালাই চাকার উপর কব্জি আর আঙ্গুলের বন্দিতে ফুটিয়ে তুলছেন বিশ্ব কর্মার নিপুন শিল্প কর্ম। আজ তিনি নিজের পৈত্রিক ভিটে থেকে অনেক দূরে। তার জন্ম স্থান ছোট্ট পয়সরাহা গ্রাম। দীপাবলিতে সেজে উঠবে তার সেই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট গহিরা নদী। মন খারাপ করবে বৈকি। কিন্তু সামনে পুজো। ‘এই সময় দু’পয়সা আয় হয়, প্রদীপ বিক্রি করে’ , বললেন সঞ্জয় বাবু। গ্রামের কথা বলতেই চোখের কোনাটা চিক চিক করে উঠল একবার।
পি/ব
No comments:
Post a Comment